একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির অরাজনৈতিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ সম্বর্ধনা

।। আহমেদ জাকারিয়া ।।
লস এঞ্জেলেস থেকে অদূরে হেমেট শহরে বসবাসকারী ধনকুবের ডাঃ কালিপ্রদীপ চৌধুরী সম্প্রতি বেশ চাঙ্গা। উত্তর আমেরিকার প্রায় সকল বাংলাদেশী অনুষ্ঠানে তিনি দান-অনুদান দিয়ে তিনি সকলের মুখে মুখে চায়ের আড্ডায় ঝড় তুলেছেন। ঐসব অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কোন মন্ত্রী প্রধান অতিথি হলে উনি বিশেষ অতিথি। উনি ব্যক্তিগতভাবে অরাজনৈতিক কিংবা ধর্ম নিরপেক্ষ কিনা তা আমি জানি না, কিন্তু তিনি একজন আঞ্চলিক মানুষ-সিলেটি। সম্প্রতি ঢাকা শহরে তিনি ১৪২ তলা ভবনের টেন্ডার জমা দিয়ে আলোচনার কেটলিতে গরম বুদ্ বুদ্ তুলেছেন। স্বয়ং অর্থমন্ত্রী মহাশয় বলে গেলেন, টেন্ডার আরো কিছু পড়েছে কিন্তু কাজটা ডাঃ কালিপ্রদীপ বাবু পেয়ে যাবেন। আমি বুঝে নিলাম আওয়ামী লীগ নামক যে রাজনৈতিক দল আজ বাংলাদেশ চালাচ্ছে তার সাথে লেন দেন সখ্যতা করে বাবু দলটির একজন কাছের মানুষ বনে গেছেন। আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর দ্বিতীয় ব্যক্তি, দেশে গত ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে আওয়ামীলীগের বিজয়ী(?) প্রার্থী আওয়ামী সরকারের দ্বিতীয় ব্যক্তি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ডাঃ কালিপ্রদীপ চৌধুরীর একান্ত ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে লস এঞ্জেলেস থেকে একশত পঁচিশ মাইল দূরে সান দিয়েগো শহরের একটি এয়ারপোর্টে প্রাইভেট জেটে অবতরণ করেন। সেখানে তাকে ডাঃ কালিপ্রদীপ চৌধুরীসহ আওয়ামী ঘরানার সিলেটি-নন সিলেটিরা ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। ডাঃ কালিপ্রদীপ চৌধুরীর আলিশান বাসার বলরুমে একটি জাকজমক অভ্যর্থনা ও নৈশ ভোজের অনুষ্ঠান হয়। স্বভাবজাত ভাবেই মন্ত্রী রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের দ্বিতীয় ব্যক্তি, তাই এ পর্যন্ত তার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ও দর্শনপ্রার্থীদের ৯৯ভাগই ছিল আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী কিংবা আওয়ামীমনা।

লস এঞ্জেলেসে বহুধাবিভক্ত আওয়ামীলীগের তিন গ্রূপের টানাটানিসহ সম্প্রতি আওয়ামীমুখী টার্ন নেওয়া বাফলা তাকে সম্বর্ধনা দেওয়ার চেষ্টা তদবির চালিয়ে আসছিল শুরু থেকেই। লোক মুখে শোনা গেছে, ওয়াশিংটন ডিসি নিবাসী মন্ত্রীর ভাই বাফলার বিরোধিতা ও বহুধাবিভক্তির কারণে আওয়ামীলীগের সম্বর্ধনা নিতে মন্ত্রীর অপারগতার কথা জানান। একই ভাবে তিনি আওয়ামী তিন পক্ষের বিরোধিতা ও যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতাদের সাথে বাফলা নেতাদের সাথে ছবিসহ প্রমাণাদি পেয়ে বাফলার দেওয়া সম্বর্ধনায় মত দিয়েও পরে তাদের না বলে দেন।

বাফলা সভাপতি নজরুল আলম ছল চাতুরির আশ্রয় নেন। তিনি লস এঞ্জেলেসের আঞ্চলিক সংগঠন জালালাবাদের সাধারণ সম্পাদকের পদটি ব্যবহার করেন। ডাঃ কালী প্রদীপ বাবু ও স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের ব্যবহার করে আগের রাতে মন্ত্রীকে জালালাবাদের সম্বর্ধনায় অংশ নেয়ার সম্মতি আদায় করে নেন।

ক্যালিফোর্নিয়া জালালাবাদের পিকনিক কিংবা ইফতারের মত বড় কর্মসূচিতে যাবার আগে সাধারণ সভায় বিষয়টি উঠিয়ে সকলের মতামত নিয়ে নেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জনাব সালিক সোবাহানের রেস্টুরেন্টে একদল প্রচারণা পিপাসু দলবাজদের নিয়ে তড়িঘড়ি কয়েকটি সভায় এই সম্বর্ধনার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়।

একইভাবে বিগত সপ্তাহ জুড়ে আওয়ামীলীগের তিন গ্রূপেরও এরকম পরামর্শ সভা চলতে থাকে। লস এঞ্জেলেসে আরো একটি দল লোক আরো জোরে শোরে পরামর্শ সভা চালিয়ে আসছিল। এরা লস এঞ্জেলেসের নুতন গজিয়ে ওঠা মুজিবাদী আওয়ামী বাফলা। ৪ দলীয় জোট সরকারের সময় এরা ভর করেছিল মুনার উপর। ২০১২-২০১৪ বি এন পি এর নির্বাচন জেতার সম্ভাবনায় এরা দল বেঁধে অংশ নিতে বি এন পি দলীয় সভায়। আর এখন নিরাশ হয়ে নব্য আওয়ামীলীগ। বঙ্গবন্ধুর নাম ছাড়া এরা এখন ভাতের লোকমা মুখে নেয় না, ধর্ম নিরপেক্ষ ও রাজনীতি বিবর্জিত বাফলা।

শোনা যায়, লস এঞ্জেলেসের আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের পিছনে ফেলে প্রচারপাগল বাফলা নেতাকর্মীর অংশ গ্রহণ-মাঠ দখল-ফটোসেশন নিশ্চিত করতেই সম্বর্ধনায় একটা অরাজনৈতিক ধর্ম নিরপেক্ষ ভাব আনার চেষ্টা চালানো হয়েছিল।

লস এঞ্জেলেস এ জালালাবাদের যে কোন অনুষ্ঠানে ৮০ভাগ সিলেটের লোক সহ সর্বাধিক জনসমাগমের রেকর্ড রয়েছে। আর এই অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি লোকজন ছিল বাফলা-বি এন পি ও মুনার, সিলেটের নির্দলীয় লোকজন ছিলই না। লস এঞ্জেলেসের সিলেটি বি এন পি গ্রূপের হাতে ছিল আওয়ামী মন্ত্রীর অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ? যারা কখনোই জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু কিংবা স্বাধীনতার স্বপক্ষের কথা শুনে অভ্যস্থ নয়। এমনকি এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক একজন বি এন পি কর্মী ও যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসিতে মর্মাহত ব্যক্তি। আওয়ামীলীগ সভাপতি শফিকুর রহমান জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বললে যারা তেড়ে গিয়েছেন-অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন তাদের কেউ কেউ বি এন পি মুনার অনুষ্ঠানের নিয়মিত বক্তা,কেউ কেউ পাকিস্তান ফেরত সেনা, কেউবা অন্তরে জামাতি। সভাপতির বিপক্ষের দুটি আওয়ামী গ্রূপের নেতারাই ছিল চেয়ারে বসে স্থির। বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা শুনলে তাদের মারমূখী তেড়ে যাবার কথা নয়। এমনটা হয়নিও।

এ ঘটনার সাথে আমি লস এঞ্জেলেসের আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। যেখানে এই অর্বাচীন আয়োজকরাই বাফলার ব্যানারে এরকমই একটি ধর্ম নিরপেক্ষে অরাজনৈতিক অনুষ্ঠানে শাহবাগের পুচকে প্রীতমের সাথে বি এন পি কেন্দ্রীয় প্রথম সারির নেতা এনাম আহমেদকে নিয়ে এসে দুজনকেই বিব্রত ও অপদস্থ করেছিল। বাফলা এমন কিছু হয়ে যায়নি যে, তারা একই অনুষ্ঠানে আওয়ামীলীগ আর বি এন পি নেতা-কর্মীদের বসিয়ে অরাজনৈতিক অনুষ্ঠান করতে পারবে যদি আওয়ামীলীগ আর বি এন পি নেতা-কর্মীরা না চায়। যদিও কিছু লোককে খাসি বানিয়ে তারা নব্য আওয়ামী লীগ- বি এন পি সার্কাস চালিয়ে আসছে। যার যার মত সংগঠনগুলোতো ভালোই চলছে। কেউ তো একে ওপরের সাথে মারামারিতে জড়িয়ে যাচ্ছে না। তাহলে অরাজনৈতিকভাবে একজন রাজনীতিকের সম্বর্ধনা কার স্বার্থে? পারলে বাফলা অথবা জালালাবাদ একটা ধর্মনিরপেক্ষ ঈদের জামাত করে দেখাক না। ক্যালিফোর্নিয়া জালালাবাদের কোন অনুষ্ঠান আজ পর্যন্ত পবিত্র কোরআন তেলায়াত ছাড়া শুরু হয়নি। তবে আজ কেন?

আমি জালালাবাদের সাধারণ সভায় অর্থমন্ত্রীর সম্বর্ধনার কথা না উঠানো, পবিত্র কোরআন তেলায়াত এর রেওয়াজ ভঙ্গ ও বাংলাদেশের অথমন্ত্রী সিলেটের গর্ব আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সামনে লস এঞ্জেলেসে প্রবাসী সিলেটবাসী, ডাঃ কালী প্রদীপ, ক্যালিফোর্নিয়া আওয়ামীলীগ সভাপতি জনাব শফিকুর রহমান সহ সকল লস এঞ্জেলেস প্রবাসী বাংলাদেশিদের অপদস্থ করার কারণে জালালাবাদের কমিটির গণ পদত্যাগ, অথবা বিলুপ্তি এবং আয়োজকদের বিচার প্রার্থনা করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here