এবার লক্ষ্য তাজমহল

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।
হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক মেরুকরণের এজেন্ডায় অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে তাজমহগল অনেকদিন আগেই চিহ্নিত হয়ে আছে। সময় সুযোগ বুঝে মাঝেমধ্যে বিতর্ক উস্কে দেবার কাজও বেশ কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনামাফিক চলছে। হালে উত্তর

 

প্রদেশে হিন্দুত্বাদীরা ক্ষমতা দখল করার পর এবং ধর্মান্ধ হিন্দুত্বের পীঠস্থান গোরক্ষপুর মন্দিরে ’সেবক’ যোগী আদিত্যনাথ রাজনীতির ভেক ধারণ করে মুখ্যমন্ত্রী হবার পর তাজমহলকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার কাজটি জোরালো করেছে। মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দুত্বাবদীদের চোখের বিষ তাজমহল। অতীতে যেমন ছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির স্বার্থে সঙ্ঘ পরিবারের পরিকল্পনায় জিগির তোলা হয় বাবরি মসজিদের নিচেই নাকি রামের জন্ম হয়। আশপাশে কয়েক গন্ডা মন্দির থাকলেও তার কোনও একটা রামের জন্মস্থান হিসেবে। আসলে রাম যেহেতু মহাকাব্যের চরিত্র, ঐতিহাসিক চরিত্র নয় তাই বাস্তবে বা ইতিহাসে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। ফলত তার জন্মানোর ব্যাপারটাই কাল্পনিক। হিন্দুত্ববাদীরা তাদের মুসলিম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বার্থেই কাল্পনিক রামের কাল্পনিক জন্মস্থান হিসেবে বাবরি মসজিদকে চিহ্নিত করেছেন এবং সেটা ’পুনরুদ্ধারে’ গণহিস্টিরিয়া তৈরি করে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছেন। এখন সেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাম মন্দির বানানোর তোড়জোড় চলছে। শুধু রাম মন্দিরই নয় অযোধ্যায় মোদী সরকার ও যোগী সরকারের বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থে তৈরি হচ্ছে রামায়ণ মিউজিয়াম, রামকথা পার্ক। অদূরে সরযু নদীর তীরে তৈরি হচ্ছে ১০০ ফুট উচু রামমুর্তি। অর্থাৎ অযোধ্যাকে ঘিরে অনৈতিহাসিক কল্প সাম্রাজ্যের এমন এক নির্মাণ যজ্ঞ শুরু করা হচ্ছে এবং তা এমন প্রচারে ঝড় তোলা হচ্ছে যাতে গোটা দেশ তো বটেই গোটা
বিশ্ব সব ভুলে গিয়ে অযোধ্যার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তাজমহল বিদ্বেষী জিগিরের পেছনে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী অযোধ্যার নতুন পরিচিতি তৈরি। তাজমহল বিশ্বের সপ্তম আম্চর্যের একটি। বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। ভারতের পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাজমহল। বিদেশি পর্যটকদের বেশিরভাগই ভারতে আসে তাজমহলের টানে। বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা দিল্লির বাইরে যেতে হলে আগে পছন্দ করেন তাজমহলকে। এমনকি বিদেশি অতিথিদের উপহার তালিকায়ও থাকে সবার আগে তাজমহলের স্বারক। এটা কোনও অবস্থাতেই হিন্দু রাষ্ট্রের প্রবক্তা হিন্দুত্ববাদীদের সহ্য হয় না। ভারতের পরিচয়ে তাজমহলের উপস্থিতি হিন্দুত্ববাদীরা মানতে পারছে না। কারণ মুসলিম বিদ্বেষের ঘটনায় হিন্দু মেরুকরণের রাজনীতিটাই তাহলে জোলা হয়ে যায়। অতএব তাজমহলকে ভারতের অস্তিত্ব থেকে মুছে ফেলে অযোধ্যায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তবে হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে চালানো সহজ হবে।

এমন এক প্রেক্ষাপটেই হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে তাজমহল। এতদিন যে কাজটা সহজ ছিল না উত্তর প্রদেশ দখলের পর সেটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। মূখ্যমন্ত্রী হবার পরই যোগী বলেছিলেন তাজমহল ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়। সরকারের ৬ মাস পুর্তিতে উত্তর প্রদেশের যে পর্যটন পুস্তিকা তৈরি হয়েছে তার থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে তাজমহলকে। অথচ উত্তর প্রদেশে যত পর্যটক যান তাদের ৯০ ভাগই তাজমহল দেখতে যান। এরপরই ধর্মান্ধ বি জে পি নেতা সংগীত সোম অর্বাচীনের মতো বিকৃত ভাষ্য হাজির করে তাজমহলের অস্তিত্ব নস্যাতের জিগির তোলেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা কথা বলা হলেও কোনও শীর্ষ নেতাই তাজমহল সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে অস্বীকার করেননি। বাক্চাতুর্যে এড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রীও। অর্থাৎ মোদী, যোগী, সোমে কোনও ভিন্নতা নেই। ধর্মান্ধ হিন্দত্বের শেকলে সকলেই বন্দি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here