ত্রাণ বহরের নামে নির্বাচনী শোভাযাত্রা এবং সরকারের নিরাপত্তার অজুহাত

।। সুব্রত বিশ্বাস ।।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বিরাট গাড়ী বহর নিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থ শিবির পরিদর্শনে রামু যাচ্ছিলেন। রথ দেখা কলা বেচা অর্থাৎ রাস্তায় সাংগঠনিক কর্মসূচী করে করে সর্বশেষ রামুতে শরণার্থী শিবির পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণ করা। এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মাথায় রেখে ঢাকা থেকে নোয়াখালী হয়ে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রা পথে রাস্তায় নোয়াখালীতে কে বা কারা একদল যুবক গাড়ী বহরে আক্রমণ করে বসে। আক্রমণে গাড়ী ভাংচুর এবং সাংবাদিক সহ অনেকেই আহত হন। আক্রমণকারী কারা ঘটনার পরক্ষণেই জানা জায়নি। পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, আক্রমণকারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। টিভি ক্যামেরায় তাদের ছবি স্পষ্ট দেখা গেছে। এজন্য বিএনপি’র পক্ষ থেকে সুষ্ঠু বিচার দাবি করা হয়েছে।
এব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কোন অজুহাত না পেয়ে নিজেরাই আক্রমণ করে আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। সাদা চোখে দেখলে বা বিচার করলে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য অনেকের কাছেই গ্রহনযোগ্য নয় বলেই মনে হয়। যদিও রাজনীতির খেলায় এরূপ অনেক কিছুই হয়। বিএনপি’র বেলায় তো আরো বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য। বিএনপির অতীত ইতিহাসে সেরূপ অনেক ঘটনা জ¦ল জ¦ল করছে

সুব্রত বিশ্বাস

। তবে আপাত ঘটনায় বিএনপি জড়িত একথা অনেকেই হয়তো বিশ^াস করেন না।
ইতিপূর্বে শারণার্থী শিবিরে ত্রাণের ট্রাক বহর নিয়ে বিএনপির যাত্রা সরকার আটকে দেয়। কেন এই আটকে দেওয়া, বিষয়টিকে দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত শরণার্থী রোহিঙ্গাদের বিএনপি ত্রাণ দেবে এতে আপত্তির কারণ দেখি না। কিন্তু ত্রাণ দেওয়ার নামে নির্বাচনী কর্মসূচী নিয়ে এই শোভাযাত্রা কেন। এত ঘটা করে গাড়ি বহর নিয়ে যাওয়া অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরকার নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে যাওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে সরকারের এরূপ সিদ্ধান্তে অন্যায় দেখিনা। সরকার এবং বিএনপি উভয়েই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখা দরকার। তাই নিরাপত্তার প্রয়োজনে ঢাকঢোল পেটানো ট্রাকবহর যেতে দেওয়া হয়নি। তবে এক্ষেত্রে সরকার যে দ্বিচারি ভূমিকা পালন করেছে বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকার মৌলবাদী গোষ্ঠী জামায়াত-হেফাজতকে অবাধে যেতে তাতে নিরাপত্তা বিঘিœত হয়না। অথচ বিএনপিকে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে আটকে দেওয়া হয়। জামাত-হেফাজত সুযোগ পেলেই শান্তি-শৃৃঙ্কলা-নিরাপত্তা বিঘিœত করতে পারে একথা সর্বজনস্বীকৃত। সরকার বলছে সকল ত্রাণ বিতরণ প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে হবে। অথচ বস্তবে কি দেখা যাচ্ছে, জামাত-হেফাজত মৌলবাদী গোষ্ঠী শরণার্থী শিবিরের মুখে ক্যাম্প বসিয়ে নিজেরাই ত্রাণ বিতরণ করছে। মজজিদ নির্মাণের নামে শারণার্থী শিবিরের ভেতরে ঢুকে মৌলবাদী প্রচারণা চালাচ্ছে। সরকার এই দ্বিচারি ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বস্তুত নিজেই পরিবেশ নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।
এখন কথা হলো, বিএনপি ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর হঠাৎ এত রোহিঙ্গা প্রীতি উথলে উঠলো কেন। ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান ও প্যালেস্টাইনে মুসলমানদের ওপর প্রতিনিয়ত আক্রমণ হচ্ছে। একদিকে সা¤্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী অন্যদিকে আইএস নামের ইসলামী গোষ্ঠী মানুষ তথা মুসলমান হত্যা করছে। এই গত সপ্তাহেই আফগানিস্তানে দু’টি মসজিদে আক্রমণ করে ৭০ জনের অধিক মুসল্লিকে হত্যা করা হয়। দু’শোর অধিক মুসল্লি গুরুতরভাবে আহত হন। তার আগের সপ্তাহে ইরাকে একইভাবে ৩০জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়। বস্তুত,ইসলামের নামে মুসলমান হত্যা নিয়মিত ও স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের কথাই যদি বলি, প্রতিনিয়ত নারী ও মহিলারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। সংখ্যালঘুরা দেশছাড়া হচ্ছেন। অথচ এসব কোন ঘটনায় তাদেরকে উথলা হতে দেখা যায়না। প্রতিবাদ করতে দেখিনা।
বছরের শুরুতেই কালবৈশাখীর তান্ডব ও বন্যার শুরু। সমগ্র দেশ বন্যায় ভেসেছে। অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড় ধ্বসে মানুষের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড় ধ্বসে দেশের দুর্গত মানুষ ত্রাণের জন্য সর্বত্র হাহাকার করছেন। দেশের এই দুর্গত মানুষের জন্য বিএনপি বা মৌলবাদী গোষ্ঠীর ত্রাণবাহী কোন ট্রাকবহর নিয়ে যেতে দেখা যায়নি। রোহিঙ্গাদের জন্যই ইসলামী আবেগ যেন উথলে উঠেছে। ভাবটা এমন দেশের মানুষ যেন দুর্যোগগ্রস্থ নন। দেশের মানুষ যেন কোন মানুষ নয়। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানে যেসব মানুষ ধর্মের নামে হত্যার শিকার তারা কোন মুসলমান নন। রোহিঙ্গারাই কেবল মুসলমান। তাই বলে রোহিঙ্গাদের প্রতি আমরা মানবতা দেখাবো না তা নয়। আমরা মানবতা দেখিয়েছি। সরকার এবং সমগ্র জাতি দেখিয়েছে। তাই বলে দেশের মানুষের চেয়ে রোহিঙ্গাদের দাবি কোনভাবে অধিক গুরুত্ব বহন করেনা।
বেগম জিয়া দেশে ছিলেন না। রোহিঙ্গাদের দেখতে যেতে পারেননি। রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে তার যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে তার ঘটা করে যাওয়া নিয়ে। রোহিঙ্গা ইস্যু একটি জটিল ও চিন্তার ব্যাপার। কারণ এর পেছনে দেশী বিদেশী চক্রান্তকারীরা জড়িত। দেশের অভ্যন্তরিন নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার সমূহ বিপদ ও আশঙ্কা জড়িয়ে আছে। এইতো গতকাল একজন শরণার্থ রোহিঙ্গার আক্রমণে একজন বাংলাদেশীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তার কাছে থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আরও অনেকের কাছে যে অস্ত্র নেই সেটি কিভাবে নিশ্চিত করে বলা যায়। তাছাড়া অনেকে এও মনে করেন শরণার্থীদের মধ্যে অনেক জঙ্গবাদী সন্ত্রাসীরাও রয়েছে।
আশঙ্কার কারণ, অতীতে বেগম জিয়া বিভিন্ন সময় চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, বিলেত, সৌদি আরব সহ বিভিন্ন দেশে গেছেন। বিতর্কিত কিছু দেশের বিতর্কিত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সাথে বৈঠক করেছেন। দেশের ভেতরে বিভিন্ন সময় গোপন বৈঠকের বিতর্কিত অভিযোগ রয়েছে। বিদেশ থেকে যখনই দেশে ফিরেছেন কোন না কোন অস্থিতিশীল ঘটনার উদ্ভব ঘটতে দেখা গেছে। সম্প্রতি ভারতের ইংরেজী দৈনিক টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার মহাখালিতে এক সেনা কর্মকর্তার বাসায় প্রাক্তন ও চাকুরিরত কিছু সেনাকর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠক হয়েছে। যদিও আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে একথাও বলেছে বৈঠকটি ধরা পড়ায় বৈঠককারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তদন্ত চলছে। বলি না এর পেছনে বিএনপি জড়িত। কিন্তু বিএনপির অতীত বিবেচনায় নিলে এর সাথে যোগসূত্র নেই অবিশ^াস করি কি করে।
বিএনপি ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর অতীত কার্যকলাপ মসৃন একথা বলা যাবে? মৌলবাদী গোষ্ঠী চরম প্রতিক্রিয়াশীল বলে তাদের কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু বিএনপি? ৪০ টি ত্রাণ বোঝাই ট্রাক নিয়ে যখন বিয়ের শোভাযাত্রা হয়, তখন টুঙ্গিপাড়ায় বোমা পুতে রাখা, যশোহরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলা, পল্টনে সিপিবির সভায় বোমা হামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, পিলখানার ঘটনা এবং সর্বশেষ ১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনাগুলো স্মৃতিপটে ভেসে উঠে না? তাই বলছিলাম মানুষ দই দেখে চুন খেয়ে মুখ পুড়লে পুনরায় দই দেখলেও চুন মনে করার কারণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অস্বীকার করার উপায় নয় সরকার গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রকে টুটি চেপে রেখেছে। অবাধ রাজনৈতিক কার্যকলাপে অবৈধ হস্তক্ষেপ করছে। গণতন্ত্রকে সুস্থ নিয়মতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে যথারীতি যথানিয়মে পরিচালিত হতে দিচ্ছে না। সরকারের এই অগণতান্ত্রিক পথচলা ক্রমান্বয়ে দেশকে অস্থিতিশীল স্বৈরাচারী পথে ধাবিত করছে।
দেশের মানুষকে নিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগ উভয় দলই বেলাল্লাপনা রাজনীতি করছে। ক্ষমতা আর ক্ষমতার রাজনীতিই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও রাজনীতি হবে দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে। রাজনীতির মুখ্য বিষয় দেশের মানুষের কল্যাণ। ক্ষমতায় গেলে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কি করবে সেটাই তুলে ধরবে। কিন্তু না, জনগণের দাবিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া কি হবে সেটাই তাদের কাছে মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনীতি নিয়ে বাদবিবাদ, মতভেদ থাকবে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। দেশের মানসম্মান, মানুষের ভবিষ্যৎ মাথায় রেখে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে তার সুরাহা বা মীমাংশা করবে। কিন্তু যখন বাইরের কোন দেশ বা দেশের নেতানেত্রী সবক দিতে দেখি সকলের অংশগ্রহনে আগামী নির্বাচন হবে। তখন দু’দলের অর্বাচীন নেতানেত্রী ও রাজনীতিকদের লজ্জা না হলেও দেশের মানুষের মুখ পড়ে। এটাই আজ উভয় দলের রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here