নিউইয়র্কে আবৃত্তি উৎসবের স্লোগান : ‘বোধের বিশ্বাসে, ভাবনাকে মজবুত করে’

0
89

নিউইয়র্ক থেকে : অনুষ্ঠান প্রায় শুরু, হঠাৎ লাইট বন্ধ, অন্ধকারে হলভর্তি দর্শক বুঝতে পারলেন না ব্যাপারটা কি হলো, চারদিক থেকে ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে, আস্তে আস্তে আলো জ্বলতে থাকে, দেখতে পাই আবৃত্তিকাররা মঞ্চের দিকে সম্মিলিত হতে থাকে, তারা উচ্চারিত করতে থাকে আবৃত্তি উৎসবের শ্লোগান-‘বিবেকের বন্ধ দরজায়/শব্দের হাতুড়িকে আজ হানো/ বোধের বিশ্বাসে, ভাবনাকে মজবুত করে/ ভাবো, আরো বেশী করে ভাবো।’
এভাবেই শুরু হয় ‘নিউইয়র্ক আবৃত্তি উৎসব ২০১৮’ এর আয়োজনটি। এই প্রারম্ভিকা শ্লোগান সম্মেলকটির পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন মিথুন আহমেদ।

রোববার নিউইয়র্ক সিটির উডসাইডস্থ কুইন্স প্যালেসে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত হল প্রবাসের আবৃত্তিকারদের এই মিলনমেলার উৎসব।নিউইয়র্ক আবৃত্তি উৎসবের সদস্য-সচিব গোপন সাহা মঞ্চে আসতে আহবান জানান, উৎসব পর্ষদের আহবায়ক আবীর আলমগীর, উপদেষ্টা মিথুন আহমেদ, উপদেষ্টা মাহতাব সোহেল এবং বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব, আবৃত্তিকার ড.সালেক খানকে।

 

আহবায়ক আবীর আলমগীর শুরুতেই তার স্বাগত বক্তব্যে নিউইর্য়কে আবৃত্তি উৎসবের জন্য একটি স্থায়ী পর্ষদ “নিউইয়র্ক রিসাইটেশন ফেস্টিভ্যাল কমিটির” চেয়ারম্যান হিসেবে সম্ভাষণ করে এই উৎসবের সৃজন ও উদ্দীপনার মুখ্য প্রাণ শিল্পজন আবৃত্তিকার মিথুন আহমেদের নাম ঘোষণা করেন।

আবীর বলেন, এই প্রবাসে দুইযুগেরও বেশী সময় ধরে আবৃত্তিচর্চার ক্ষেত্রে অভিভাবক হিসেবে মিথুন আহমেদকে সবসময় পেয়েছি। আমরা যারা এই আবৃত্তি চর্চার সাথে যুক্ত আছি, আবৃত্তির জন্য কোন অনুষ্ঠান, কোন প্ল্যাটফর্ম আমরাই মনে হয় নিজেদের জন্য তৈরী করতে পারিনি এতো বছরে। সেকারণেই আমরা শুধুমাত্র আবৃত্তিশিল্পীরা আবৃত্তি করব, আবৃত্তি শুনব, আবৃত্তি শোনাব-এই বাসনাটি মনের মধ্যে রেখে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম একটি উৎসবের মধ্যদিয়ে সবাই একত্রিত হয়ে মনের ইচ্ছেটাকে যেন স্থাপন করতে পারি। বিভিন্ন পর্যায়ের আবৃত্তিশিল্পীরা উৎসবের পরিকল্পনার খুটিনাটি বিষয়গুলো আমরা আমাদের অভিভাবক মিথুন আহমেদের সঙ্গে বিষদ আলোচনা করি, যার ফসল আজকের এই উৎসব”।

এ সময় আরো জানানো হয়, উৎসব শেষ হবার সাথে সাথে আহবায়ক ও সদস্য-সচিব পদ এবং উৎসব পর্ষদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই উৎসবের আহবায়ক আবীর আলমগীর উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হবেন, প্রতি দুই বছর অন্তর উৎসব হবে। আগামী আবৃত্তি উৎসব হবে ২০২০ সালে-এই ঘোষণাও দেয়া হয়।

উৎসব পর্ষদের উপদেষ্টা মিথুন আহমেদ বলেন, “আবৃত্তি একসময়ে খুব ভালোবেসে করতাম, এখনো আবৃত্তি করতে চাই, আর সেটা খুব ভালোভাবেই করতে চাই। আমি মনে করি এই উৎসবের মাধ্যেমে দুটি কাজ হলো আবৃত্তিকাররা তাদের চর্চাকে আরো ভালো করার ব্যাপারে সচেষ্ট হবেন, আর নিজেদের মর্যাদাবোধ নিয়ে অন্যান্য অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করতে যাবেন”।

 

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আবৃ্ত্িত নিয়ে নতুন নতুন কাজ হবে, সঠিক কাজ হবে। যারা আবৃ্ত্িত করবেন শুধু কন্ঠের কারণে নয়, বোধ চিন্তা এবং আদর্শিক জায়গা থেকে আবৃত্তি করবেন। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মত আবৃত্তি নয়, আবৃত্তি আসলে চেতনার জায়গা থেকে উৎপত্তি হয়েছে।’ এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখার জন্য আবৃত্তিকারদের অনুরোধ জানান।
বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব,আবৃত্তিকার ড.সালেক খান মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মুহুর্তেই প্রদীপের সাদা সুতায় লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে। পুরো হলের সেট ডিজাইন, লাইট, লাল কাপড়ের ব্যবহার আর প্রদীপের আলোয় মনে হলো রক্তিম সূর্যের আলোর আভায় শুভময়তা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

ড.সালেক খান বলেন, “আপনারা যারা আবৃত্তির সঙ্গে জড়িত তাদের প্রতি রইলো শুভেচ্ছা। আবৃত্তি যেনো আবৃতি হয়ে না যায়, উচ্চারণের ক্ষেত্রে শুদ্ধ উচ্চারণটাই যেনো করি, ভয়টা যেনো থাকে। যেদিন ভয়টা শেষ হয়ে যাবে সেদিন আপনার পাঠও শেষ হয়ে পাবে। যে কোনো পরিবেশনের ক্ষেত্রে দুটো দল থাকে, একদল খেলে, পরিবেশন করে, তারা পরিবেশক। আর একদল থাকে দর্শকশ্রোতা, আপনাদের মতো, তারা শোনে, দেখে, শ্রবণ করে, খেলাটা জমে উঠে। আজকে যারা খেলবেন, তারা আবৃত্তিকার, আবৃত্তিশিল্পী, কন্ঠশিল্পী। তাদের প্রতিপাদ্য বিষয় কবিতা, যার আরেক নাম সাহিত্য, যার আরেক নাম রসশাম্ত্র। এই দুই দলই যা আস্বাদন করবেন তা রস। এই প্রেক্ষাগৃহে যা গুঞ্জরিত হবে তাও রস। এই রসের সন্ধানে যারা অবিরাম বিচরণ করেন মননে এবং পার্থিবে তারা বিদগ্ধ। এই বিদগ্ধজনের সভা শুভহোক, শুভহোক; কন্ঠশিল্পের এই আয়োজন শুভ উদ্বোধন।”

এই উৎসব উৎসর্গ করা হয়েছে কবি ও ভাষা সংগ্রামী বেলাল চৌধুরী এবং আবৃত্তিকার ও মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফ-কে। কবি ও ভাষা সংগ্রামী বেলাল চৌধুরী জীবনচরিত পাঠ করেন মিজানুর রহমান বিপ্লব এবং আবৃত্তিকার ও মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফের জীবনচিত্র পাঠ করেন ড. বিলকিস রহমান দোলা।আয়োজকরা সালেক খানকে উৎসব স্মারক উত্তরীয় পরিয়ে দেন সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ।

উদ্বোধনী বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশনার মাধ্যমেই শুরু হয় আবৃত্তি পর্বের। পরিচালনা করেন শান্তা শ্রাবনী। এরপর শুরু হয় একক আবৃত্তি পর্বের। পালাক্রমে আবৃত্তি করেন শরফুজ্জামান মুকুল, সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য, জয়া চ্যাটার্জী, লুবনা কাইজার, ফারুক আজম ,ফারুক ফয়সল, এজাজ আলম, মোল্লা বাহাউদ্দিন পিয়াল, মেহের কবীর, হীরা চৌধুরী, রীপা নুর, আনোয়ারুল হক লাভলু, রাহাত আল মুক্তাদির, নাসিমা আক্তার, তন্ময় মজুমদার, হোসেন শাহরিয়ার তৈমুর, দুররে মাকনুন নবনী, শ্যামোলিপী শ্যামা, শুক্লা রায়, তাহ্রিনা পারভীর প্রীতি, নজরুল কবীর, ড. বিলকিস রহমান দোলা, মুমু আনসারী, শিরিন বকুল, শান্তা শ্রাবনী, আশরাফুল হাবিব চৌধুরী মিহির, পারভীন সুলতানা, সেমন্তী ওয়াহেদ, মিজানুর রহমান বিপ্লব, গোপন সাহা, আবীর আলমগীর, আহকাম উল্লাহ্ ও মিথুন আহমেদ।

নতুন প্রজন্মের লিওনা মুহিত, নাহরীণ ইসলাম, নুহা কাওসার, মুন জেবিন হাই, গুঞ্জরি সাহা, জারিন মাইশা, আবিবা ইমাম দ্যুতিও চমৎকার করেছে।নিটোল সমন্নিত এই সুন্দর আয়োজনে নিউইর্য়ক সহ অন্য ষ্টেটে বসবাসরত প্রথিতযশা আবৃত্তিকাররা তাদের পছন্দের কবিতা নির্বাচন করেছেন। তাদের কবিতার মাধ্যমে উঠে এসেছে চিঠিপত্র, ছড়া, সমাজ-বোধ, প্রেম ও প্রকৃতি, পুজা, নারী, মা,স্বদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বিদ্রোহ, দেশাত্ববোধ ও রাজনীতির মতো বিষয়।

গতানুগতিকের প্রথা ভেঙ্গে সকল আবৃত্তিকারের পরিবেশনার মান ছিলো উচ্চতর, সবাই সবার সেরা পরিবেশনা দেবার ব্যাপারে খুবই সজাগ ছিলেন। অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে যে কয়েকজন কে খুব বেশী পরিশ্রম করতে দেখা গেছে,তাদের মধ্যে আশরাফুল হাবিব চৌধুরী মিহির, সেমন্তী ওয়াহেদ, মিজানুর রহমান বিপ্লব, আবীর আলমগীর ও মিথুন আহমেদ।

সকল আবৃত্তিকারই কম বেশী শব্দ আর আলোর ব্যবহার করেছেন ,কিন্তু সেমন্তী ওয়াহেদের একটি পরিবেশনা ছিলো নারীকে নিয়ে, সেই পরিবেশনাটা একটা আলাদামাত্রা যোগ করেছে এই আয়োজনে। তার গ্রন্থনার যে নির্বাচন সেটা বাইলিঙ্গুয়াল পরিবেশনা ছিলো, সেখানে একটি ছায়ানৃত্য ছিলো, তাতে লাল আলো ব্যবহার করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে এ্কজন নারী যে বেঁচে উঠেছে। সেটা এই উৎসবের শ্লোগানের পরিপূরক ছিল।

বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় আবৃত্তি পর্বের। এ পর্বেরও পরিচালনা করেন শান্তা শ্রাবনী। এরপর আহবায়ক ও সদস্য সচিব উপস্থিত দর্শদেরকে ‘নিউইয়র্ক আবৃত্তি উৎসব ২০১৮’ এর কমিটির সদস্যদেরকে পরিচয় করিয়ে দেন ও সকলকে ধন্যবাদ দেন।

‘নিউইয়র্ক আবৃত্তি উৎসব ২০১৮’ এর ঘোষণাপত্রে বলা হয় “আবৃত্তি শিল্পের ইতিহাস এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। দীর্ঘ ঐতিহ্যের এবং দীর্ঘ চর্চার সাংগঠনিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকে এই আবৃত্তিকলা জনমুখী শিল্প হিসেবে শক্তিশালী গণসম্পৃক্ততার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আবৃত্তি সংগঠিতভাবে চেতনা ও আদর্শকে প্রকাশ করবার একটি শিল্পমাধ্যম। আবৃত্তিশিল্প তার স্বমহিমায় আজ বিকশিত। আজকের এই উৎসব প্রাঙ্গনে, আজকের এই সমাগমে, আজকের এই উপস্থিতিতে আমরা সেই তিন দশক পূর্বের চেতনার ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা সমন্বিত হয়ে প্রবাসের এই প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্ক আবৃত্তি উৎসব ২০১৮’র মঞ্চে দাঁড়িয়ে- সেই একই অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি। শিল্পের চর্চায় শুদ্ধতার বিকাশে চেতনার অঙ্গীকার প্রকাশে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহনকে শিল্প অভিযাত্রায় একমাত্র পথ। আাবৃত্তিশিল্পীরা মনেপ্রাণে ধারন করে বাঙ্গালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গৌরবের ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও গৌরবগাঁথা যা অবিরতভাবেই প্রকাশিত হবে আমাদের সকল শুদ্ধ চর্চা এবং পরিবেশনায়। যে প্রত্যাশা, যে ভাবনা নিয়ে বহি:বিশ্বে এই প্রথম আবৃত্তি উৎসবের মহামিলনে একত্র হয়েছিলাম সেই মহান উচ্চারিত সত্য আমাদের শিল্পী জীবনের প্রতিটি চর্চার ক্ষেত্রে আমরা যেনো ধারন করি, এবং আমাদের ব্রত যেনো বলিয়ান থাকুক এই দীপ্ত শপথে ‘বিবেকের বন্ধ দরজায় / শব্দের হাতুড়িকে আজ হানো/ বোধের বিশ্বাসে, ভাবনাকে মজবুত করে/ভাবো,আরো বেশী করে ভাবো।’

নিউইয়র্ক আবৃত্তি উৎসব ২০১৮ এর প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন আশরাফুল হাবিব চৌধুরী মিহির। স্মরণিকা সম্পাদনা ও অলংকরণ এর দায়িত্বে ছিলেন নজল কবীর আর সহযোগীতায় ছিলেন ড. বিলকিস রহমান রুদোলা ও মেহের কবীর। স্মরণিকার প্রচ্ছদ পেইন্টিং করেছেন তাজুল ইমাম, গ্রাফিক্সে ছিলেন জাহেদ শরিফ, উৎসব নকশা করেন টিপু আলম ।

আয়োজনে তবলায় জনম সাহা এবং ছায়ানৃত্যে ছিলেন সুষনা চৌধূরী। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলো রায়হান জামান, শিবলী নোমানী, নাসিমা বানু চাঁপা, কান্তা আলমগীর,সুতপা মন্ডল, বিশ্বজিত সেনগুপ্ত, নূসরাত এলিন, শিরিন ইসলাম, শহীদ উদ্দিন, লালন নূর। উৎসবে আরো যারা নিবন্ধন করেছেন তার অন্যতম জি. এইচ. আরজু, ইভান চৌধুরী, তিতাস মাহমুদ, সেলিম ইব্রাহীম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here