‘নাঈম-হৃদয়’র চির বিদায় ॥ ব্রুকলীনে জানাজায় মানুষের ঢল ॥ গ্রামের বাড়ীতে দাফন সম্পন্ন

0
58

নিউইয়র্ক: স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে গিয়ে সলির সমাধির শিকার বাংলাদেশী যুবক মাইমুল ইসলাম হৃদয় (২১) ও শাহাদাত হোসেন নাঈম (১৮)-কে চির বিদায় জানিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। নিউইয়র্কে উভয়ের নামাজে জানা শেষে তাদের মরদেহ বিমান যোগে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

গত ৩ জুন রোববার ব্রুকলীনের বাংলাদেশ-মুসলিম সেন্টারে ‘অকালে ঝরে যাওয়া’ এই দুই তরুণের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ৪ জুন সোমবার রাতে উভয়ের মরদেহ আমিরাত এয়ারলাইন্সের একটি বিমান যোগে ঢাকায় পাঠানো হয়। তাদের নামাজে জানাজায় নামে মানুষের ঢল। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সসাস অঙ্গরাজ্যের সীমান্তবর্তী নদীতে ভেসে উঠা ‘নাঈম-হৃদয়’-এর মরদেহ মাতৃভূমিতে পাঠানোর ব্যাপারে সার্বিক উদ্যোগ নেয়া ও সহযোগিতার জন্য প্রবাসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আঞ্চলীক সংগঠন বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনক’র কর্মকান্ড কমিউনিটিতে প্রশংসিত হয়েছে।

এদিকে ঢাকা থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ‘নাঈম-হৃদয়’র মরদেহ বুধবার (৬ জুন) ঢাকায় পৌছার পর তাদের স্বজনরা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করে তাদের নিজ গ্রামে নিয়ে যান। ‘নাঈম-হৃদয়’র মরদেহ গ্রামের বাড়ীতে পৌছলে সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় এবং পরবর্তীতে জানাজা শেষে গ্রামের কবর স্থানে উভয়ের মরদেহ দাফন করা হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষ জানাজায় অংশ নেন। ড্রাম-এর কমিউনিটি অর্গানাইজার কাজী ফৌজিয়া বুধবার ইউএনএ প্রতিনিধিকে ‘নাঈম-হৃদয়’র দাফন হওয়ার খবরটিও নিশ্চিত করেছেন এবং সর্বশেষ অবস্থার খোঁজ-খবর রাখছেন।

উল্লেখ্য, গত মে মাসের শুরুর দিকে ‘টেক্সাস-মেক্সিকো’ সীমান্তবর্র্তী রিও-রিভারে ডুবে প্রাণ হারান বৃহত্তর নোয়াখালীর সন্তান ও টগবগে তরুণ ‘মাইমুল ইসলাম হৃদয়’ এবং ‘শাহাদাত হোসেন নাঈম। যদিও নদীতে ভেসে উঠে হতভাগা এ দুই তরুণের গলিত লাশ দেখার সুযোগ ছিল না কারোরও। এর আগেও গত বছর পানামা খালে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছিল আরমান নামের এক বাংলাদেশী তরুণ। সেই হতভাগার দলে এবার যোগ হলো আরো দু’জন। খবর ইউএনএ’র।

স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় পাড়ি জমাতে এসে হতাভাগা দুই বাংলাদেশীর করুণ মৃত্যুর খবর আগেই জানাজানি হয়। ব্রুকলীনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এভিনিউ এলাকায় অবস্থিত ‘বাংলাদেশ-মুসলিম সেন্টারে’ রোববার মরদেহবাহী কফিন যখন এসে পৌঁছায় তখন উপস্থিত বাংলাদেশীদের মাঝে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা।

নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘দেশিজ রাইজিং আপ অ্যান্ড মুভিং’ (ড্রাম)-এর সহায়তায় ‘নাঈম-হৃদয়’-এর মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ। এর আগে গত ২ জুন শনিবার রাতে বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির উদ্যোগে টেক্সাস থেকে হৃদয় ও নাঈমে’র মরদেহ নিউইয়র্কে আনা হয়। রোববার জানাজা শেষে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে জরুরী সভায় মিলিত হন সংগঠনের কর্মকর্তারা। নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলীনে সংগঠনটির নিজস্ব ভবনে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সভাপতি আব্দুর রব মিয়া। সভায় দু’জনের মরদেহ দেশে পাঠানোর সবশেষ অবস্থা তুলে ধরেন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মিন্টু।

জাহিদ মিন্টু জানান, গত ১৪ মে শাহাদাত হোসেন নয়ন ও মাইমুল ইসলাম হৃদয়ের লাশ টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্ত সংলগ্ন ওয়েব কাউন্টিতে রাইয়ো গ্র্যান্দে নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। দেশী-বিদেশী দালালকে মোটা অংকের অর্থ দিয়ে আরও কয়েকজনের সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বিভিন্ন দেশ ঘুরে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার সময় নদীপতে মৃত্যুবরণ করেন।

জাহিদ মিন্টু জানান, ১৭ দিন পর অর্থাৎ গত ১ জুন শুক্রবার রাতে টেক্সাস থেকে ‘হৃদয়-নাঈম’-এর মরদেহ নিউইয়র্কে আনা হয়। ড্রাম-এর সহযোগিতায় নোয়াখালী সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ বাংলাদেশে উভয়ের গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ড্রাম-এর কমিউনিটি অর্গানাইজার কাজী ফৌজিয়া বলেন, টেক্সাসের মেডিকেল এক্সামিনারের প্রসেসিং সেন্টার থেকে ‘হৃদয়-নাঈম’-এর মরদেহ উদ্ধার করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। কারণ, উভয়কেই বেওয়ারিশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ‘নাঈম-হৃদয়’-এর লাশ দেশে পাঠানোর মানবিক উদ্যোগ নেয়ায় এর সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ড্রামের কাজী ফৌজিয়া।

এদিকে নামাজে জানাজার আগে ড্রাম-এর সাথে সংশ্লিষ্টরা জানাজা নামাজের পর উভয়ের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় এবং প্লাকার্ড হাতে ‘দূর্গম পথ পেরিয়ে’ আমেরিকা না আসার দাবীর কথা তুলে ধরেন। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নাঈমের চাচা মামুন জানিয়েছেন, সংগ্রহকৃত অর্থে তাদের লাশ দেশে পাঠানো সহ যাবতীয় আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলেও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকায় নাঈমের পরিবার কোন সহায়তা নিচ্ছেন না।

জানা গেছে, স্বপ্নের দেশের সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করা ‘নাইমুল ইসলাম হৃদয়ের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। আর ‘শাহাদাত হোসেন নাঈমের’ বাড়ি ফেনির সোনাইমুড়ি উপজেলার দেউটি ইউনিয়নে। ‘নাঈম ও হৃদয়-এর মতো আর যাতে কাউকে এভাবে ঝরে পড়তে না হয় সে বিষয়ে পরিবার থেকে শুরু করে সবাইকে আরো সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশী কমিউনিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here