নিউইয়র্কে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি

নিউইয়র্ক সিটি হিউম্যান রাইটস কমিশনের কমিশনার কারমেলিন বক্তব্যে রাখছেন।

বর্ণমালা নিউজ : বহু জাতি ও ভাষার শহর নিউইয়র্ককে ইমিগ্র্যান্টদের স্বর্গরাজ্য বলা হলেও এখানে মুসলমান-ইহুদী ও শিখ ধর্মের মানুষরা সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্বেষমূলক আচরণ- জাতিগত আক্রোশের শিকার হচ্ছেন। যা ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার জের ধরে ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব ঘটনার সিংহভাগই রয়ে যাচ্ছে অজানা। এ তথ্য বেড়িয়ে এসেছে সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিটি কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের প্রতিবেদনে।

নিউইয়র্কের ৩,১০০ জন মুসলমান, আরব, দক্ষিণ এশীয়, ইহুদী শিখের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনের উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর সব তথ্য। এরমধ্যে ৪০ শতাংশ মৌখিকভাবে বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন, ৯ শতাংশ শারীরিকভাবে ২০ শতাংশ কাজের জায়গায় নানাভাবে হয়রানীর মুখে পড়েছেন। আর হয়রানী ও বিদ্বেষ ও হেইট ক্রাইমের শিকার ৭১ শতাংশই বিষয়টি পুলিশ বা অন্য কোন মানবাধিকার বা কমিউনিটিভিত্তিক ধর্মীয় সংস্থার কাছে প্রতিবিধান চেয়ে রিপোর্ট করেননি। ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার মুসলমানদের চেয়ে ইহুদীরা বেশী হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ৮গ ভাগ ইহুদী লাঞ্চিত হয়েছেন বা বাড়ী বাড়ী-ঘর বা সম্পদের উপর হামলার ঘটনাটি সবাইকে অবাক করেছে। আর এসব ঘটনার বেশীর ভাগই ঘটেছে ব্রুকলীন বরোতে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটিতে ধর্মীয় এবং জাতিগত বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ইতিপূর্বে পুলিশ কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অথবা ধর্মীয়/কম্যুনিটিভিত্তিক সংস্থায় অভিযোগ করে কোন প্রতিকার না পাওয়ায় গত বছর ৭১ শতাংশ ভিকটিমই বিচার প্রার্থনায় আগ্রহী হয়নি। নিউইয়র্ক সিটির হিউম্যান রাইটস কমিশনের জরিপে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এ জরিপ চালানো হয় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে গত বছরের শেষার্ধ পর্যন্ত। বাংলা, ইংরেজী, আরবী, রাশিয়ান, হিন্দি, উর্দু, হিব্রু-এই ৭ ভাষায় পরিচালিত জরিপে অংশ নেন ৩১০০ জন। দক্ষিণ এশিয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান ছাড়াও শিখ ও ইহুদীরাও অংশ নেন এতে। এই জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে গত গত ১৯ জুনমঙ্গলবার ব্রুকলীনে আরব-আমেরিকান ফ্যামিলি সাপোর্ট সেন্টারে এক অনুষ্ঠান হয়েছে কমিশন অন হিউম্যান রাইটসের পক্ষ থেকে। স্বাগত বক্তব্য এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কী করা উচিত তা নিয়ে খোলামেলা মতামত ব্যক্ত করেন কমিশনার কারমেলিন পি মালালিস।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে- ৩৮.৭% কোন না কোনভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন, ৮.৮% শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, ১৬.৬% ধর্মের পরিচয়ে, বর্ণ অথবা জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন কর্মক্ষেত্রে অথবা চাকরির ইন্টারভিউর সময়, ২৭% নারী হেনস্থার শিকার হন হিজাব পরিহিত অবস্থায় সিটির সাবওয়েতে, ৮০% ইহুদী লাঞ্ছিত হয়েছেন অথবা বিদ্বেষমূলকভাবে তাদের সম্পদের ওপর হামলা হয়েছে, ১৯% দক্ষিণ এশিয়ানই কর্মক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হয়েছেন। এমন পরিস্থিতির শিকার ৭১% বলেছেন যে, তারা আক্রান্ত হবার তথ্য পুলিশ কিংবা কম্যুনিটিভিত্তিক সংগঠন অথবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করেননি। কারণ, এর আগে অভিযোগ করে কোন প্রতিকার দূরের কথা, উল্টো হুমকির শিকার হয়েছেন। জরিপে অংশ নেয়া শিখ সম্প্রদায়ের অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর বয়েসীরা বলেছেন যে তারা আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়রানি-নাজেহাল-লাঞ্ছিত হচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিউইয়র্ক সিটির এই মানবাধিকার কমিশন সুপারিশ করেছে যে, কম্যুনিটিভিত্তিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সক্রিয় একটি নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে হবে। যার মাধ্যমে ভিকটিমরা বিচার প্রার্থনায় উৎসাহিত হতে পারবেন। দুর্বৃত্তদের যদি গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায় তাহলে দ্রুত হ্রাস পাবে এমন জঘন্য ঘটনাবলি।

রিপোর্টে বলা হয় , জুইশ ফর র‌্যাসিয়েল এ্যান্ড ইকনোমিক জাস্টিস, সোউটো ইয়েটো সেন্টার ফর আফ্রিকান উইমেন, শিখ কোয়ালিশন, কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স’র নিউইয়র্ক চ্যাপ্টার, আরব-আমেরিকান এসোসিয়েশন অব নিউইয়র্ক, আরব-আমেরিকান ফ্যামিলি সাপোর্ট সেন্টার, ছায়া-সিডিসি, মানবাধিকার কমিশনের স্টাফকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্যে। তৃণমূলে কথা বলতে হবে। অভয় দিতে হবে যে, অবিচার কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘতর হবে যদি ভিকটিমরা সোচ্চার না হন। এমনকি সিটির এই মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমেও অভিযোগ করা যাবে। অনলাইন অথবা টেলিফোনেও তথ্য জানানোর সুযোগ রয়েছে। নির্ভয়ে যেন সকলে অভিযোগ পেশ করেন। পুলিশী এ্যাকশন অবশ্যই দ্রুত শুরু হবে মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে ঘটনাবলি উপস্থাপন করা হলে। এই কমিশনের টেলিফোন নম্বর হচ্ছে ৭১৮-৭২২-৩১৩১।

নিউইয়র্ক সিটি হিউম্যান রাইটস কমিশনের কমিশনার কারমেলিন তার বক্তব্যে বলেন, সিটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতি-ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় জিরো টলারেন্স মনোভাব রয়েছে সিটি প্রশাসনে।

কোথায় তারা তাদের ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান করেন কিংবা কী তার দৈহিক আকার বা কোত্থেকে তিনি এসেছেন-এসব কারণে কেউ নাজেহাল, আক্রান্ত বা লাঞ্ছিত হবেন-এটি নিউইয়র্ক সিটি কখনো মেনে নেবে না। কাউকেই বৈষম্যের শিকার হতে দেয় না । এমন পরিস্থিতি দমনে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here