ব্রাজিল-ফ্রান্স নাকি অন্য কেউ?

0
11

স্পোর্টস ডেস্ক: নিভে যাচ্ছে লাল-নীল দীপাবলি। মেঘনাদবধ কাব্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘একে একে শুখাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটি’ হাহাকারের প্রতিধ্বনি বিশ্বকাপের মঞ্চে। প্রথম রাউন্ডে জার্মানিকে দিয়ে শুরু, দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা, স্পেন, পর্তুগালও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পথগামী। ৩২ থেকে কমতে কমতে বিশ্বকাপ এসে ঠেকেছে আট দলে। সেই অষ্টকে এই চতুষ্টয় থাকবে না, বিশ্বকাপ শুরুর আগে কে ভাবতে পেরেছিলেন!

তবু তো সব আলো নিভে যায়নি। ঝরে যায়নি সব ফুল। নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে ক্রমশ প্রস্ফুটিত ব্রাজিলের হলুদ। ফ্রান্সের নীল আলোয় ধরছে চ্যাম্পিয়নের রং। বনেদিয়ানার সাদা নিশান উড়িয়ে ইংল্যান্ড টিকে আছে দাঁত কামড়ে। উরুগুয়ের ঐতিহ্যের ফুল সৌরভ ছড়াচ্ছে এখনো। স্বপ্ন ছাড়ানো অর্জন এরই মধ্যে হয়ে গেছে রাশিয়া, সুইডেন, হয়তো

ক্রোয়েশিয়ারও। আর বেলজিয়ামের আকাশে উড়ছে আশার আবির। নতুনের আবাহনে আনকোরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের প্রতিশ্রুতি তাঁদের প্রতি পদক্ষেপে।

না হয় কাঙ্ক্ষিত সব দল উঠে আসতে পারেনি বিশ্বকাপের শেষ আটের চৌকাঠে! কিন্তু এমন রোমাঞ্চে ঠাসা, অঘটনে ভরপুরে চ্যাম্পিয়নশিপই বা কে দেখেছে কবে!

টিকে থাকা আট দলের মধ্যে বিশ্বকাপজয়ী দেশ চারটি—ব্রাজিল, উরুগুয়ে, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। বাকি চতুষ্টয়ে সুইডেনের সর্বোচ্চ সাফল্য নিজ দেশে অনুষ্ঠিত ১৯৫৮ আসরে রানার্স-আপ হওয়া। ক্রোয়েশিয়ার দৌড় সেমিফাইনাল পর্যন্ত, ১৯৯৮ সালে—অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার হয়েও তাই; শেষ চার পর্যন্ত উঠেছিল দুইবার, ফাইনালে যাওয়া হয়নি কোনোবার। বেলজিয়াম ফুটবলের সোনালি প্রজন্মও যেমন ১৯৮৬ সালে আটকে যায় সেমিতে। আর রাশিয়া তো ‘রাশিয়া’ হওয়ার পর প্রথম রাউন্ডের গণ্ডিই পেরোতে পারেনি কখনো; সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে ১৯৬৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত যায় অবশ্য।

এই চার দেশের কেউ এবার বিশ্বকাপ জিতবে—অমনটা তারা নিজেরাও সম্ভবত বিশ্বাস করে না।

ওদিকে সাবেক চার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মধ্যে ফ্রান্স-উরুগুয়ে মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখান থেকে ঝরে পড়তে হবে এক দলকে। এ ম্যাচের বিজয়ী আবার সেমিফাইনালে খেলবে ব্রাজিল-বেলজিয়াম ম্যাচের জয়ী দলের সঙ্গে। প্রত্যাশানুযায়ী কাজানের কালকের সেমিফাইনালে ব্রাজিল জিতলে সেন্ট পিটার্সবার্গে হবে শেষ চারের সে লড়াই। ড্রয়ের অন্য প্রান্তে ইংল্যান্ড রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থায়। গ্যারেথ সাউথগেটের দলের ফাইনালে ওঠার পথে আর কোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নেই। সুইডেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল জিতলে সেমিতে রাশিয়া-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। তাতে জিতলে মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ১৫ জুলাইয়ের ফাইনাল।

কাগজ-কলমের হিসাবে জার্মানি-আর্জেন্টিনা-স্পেন-পর্তুগালের এখনো থাকার কথা ছিল রাশিয়ায়। কিন্তু বাক্সপেটরা গুটিয়ে তারা ফিরে গেছে দেশে। বিশ্বকাপটাই যখন অঘটনের, তখন তো আগে থেকে পূর্বানুমানের উপায় নেই। তবু কোয়ার্টার ফাইনালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে টুর্নামেন্টের মশাল দিয়ে দেওয়া যায় ব্রাজিল ও ফ্রান্সকে। অঘটনের বিশ্বকাপকে চূড়ান্ত অঘটনের হাত থেকে ‘বাঁচানোর’ জন্য এ দুই দলের কারোই শিরোপা জেতার দায় এখন।

বিশ্বকাপে পরাশক্তিদের এত দ্রুত ঝরে পড়ার শেষ উদাহরণ ২০০২ আসরে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ এবং ২০০০ ইউরোজয়ী ফ্রান্স সে আসরে যায় অন্যতম ফেভারিট হিসেবে। কিন্তু গ্রুপ পর্বের গণ্ডিই টপকাতে পারে না। বাছাই পর্বে দুর্দান্ত খেলা আর্জেন্টিনারও অভিন্ন পরিণতি। লুইস ফিগো, রুই কস্তা, পলেতাদের সমন্বয়ে পর্তুগালের সোনালি প্রজন্মও বিস্ময়করভাবে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পোল্যান্ডের গ্রুপের সেরা দুইয়ে থেকে যেতে পারে না শেষ ষোলোতে। ইতালি হাঁচড়ে-পাঁচড়ে গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে যায় বটে, তবে সেখানে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে নেয় বিদায়।

বাকি পরাশক্তিরা এগোতে থাকে প্রত্যাশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আর প্রত্যাশা পেরোনো অর্জনে দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক উঠে যায় সেমিফাইনাল পর্যন্ত। কিন্তু সেখানে জার্মানি ও ব্রাজিলের কাছে হেরে থেমে যায় দল দুটির স্বপ্নযাত্রা। পরাশক্তিদের পতনের বিশ্বকাপে শিরোপার লড়াইয়ে অন্তত মুখোমুখি ইতিহাসের সফলতম দুই দল।

এবারের আসরের সেরা দুই দল ব্রাজিল-ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়ে যাওয়ার কথা সেমিফাইনালে। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের সামনে বেলজিয়াম-উরুগুয়ে থাকলেও এ দুই দলের একটির ফাইনালে না যাওয়া হবে আরেক বড় অঘটন। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে তা আবার অত বড় বলে বিবেচিত হবে না। আবার তারা ফাইনালে গেলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।

চূড়ান্ত আশ্চর্যের হবে, ব্রাজিল-ফ্রান্সের কেউ শিরোপা না জিতলে। পরাশক্তিদের পতনের মিছিলে বিশ্বকাপের পতাকা যে এখন ওই দুই দলের হাতে! ব্রাজিলের হলুদ আর ফ্রান্সের নীলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here