ভূতের বাড়িতে অতিথি

0
16

– জামান বললেন, স্যার আমাদের পিকনিকে যেতেই হবে কিন্তু।

– আমি কি পারব? বুড়ো মানুষ শরীরে কুলাবে?

– স্যার আপনি অন্যদের পিকনিকে গেছেন, তারা খুব খুশি হয়েছে। দয়া করে আমাদের বঞ্চিত করবেন না।

– আচ্ছা দেখি। আর গেলেই তো ধরবেন স্যার, সবাই গান শুনতে যাচ্ছে। আচ্ছা এক কাজ করুন নিশাত ভালো গায় এবং ভালো নাচে তাকে যদি নিতে পার তাহলে আমি যেতে চেষ্টা করব।

– নিশাতকে চিনলাম না?

– নিশাত সিএজি স্যারের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করে।

– ও আচ্ছা ।

তার ঠিকানা বলে দিলাম।

– আর শতাব্দী সেও সিএজি স্যারের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করে তাকেও নিয়ে নিও।

পিকনিকের দিন জামান তার অফিসারকে দিয়ে শতাব্দী ও নিশাতকে নিয়ে আসি গাড়িতে করে। রাস্তায় আমরা যোগ দিই এবং আমাদের গাড়িতে তুলে নিই। আহা কি আনন্দ দুটি কন্যা আমার গাড়িতে। দুটিই খুব গুণী। মিষ্টি আর লম্বা। কিন্তু দুজনেই মোটরে উঠলে বমি করে। যাহোক বমি-টমি করতে করতে নরসিংদীতে পিকনিক স্পটে পৌঁছলাম। এটা একটা থিম পার্ক। অনেক রকমের রাইড আছে। ঢুকতেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমাদের মত আরও অনেক পার্টি এসছে। উৎসবের মত।

সামনে পড়ল বোট, প্যাডেল বোট। উঠলাম আমরা সকলে। কন্যা দুটি তাদের লম্বা লম্বা ঠ্যাং দিয়ে জোরে জোরে প্যাডেল ঘুরাচ্ছে। কিন্তু স্পিড উঠছে না। আমি কারণটা বুঝতে পারলাম। তারা বলল কি কারণ তাড়াতাড়ি বলুন। আমি বললাম ভয়ে না নির্ভয়ে। সবাই বলল নির্ভয়ে। আমি বললাম সওয়ারির মধ্যে একজন আছে ওজনদার এজন্য স্পিড উঠছে না। সকলে এক সাথে হেসে নিল একচোট। বোট চড়ে টড়ে একসময় ঘাটে ফিরে আসলাম। এবার একজন একজন করে নামবে। আমি বললাম এবার তোমরা একটু লক্ষ্য রেখো কে নামলে নৌকাটি ভেসে উঠে। দেখা গেল ঠিকই একজন নামার সাথে সাথে নৌকা আধা হাত ভেসে উঠল পানির উপর। বিষয়টি সবাই বুঝলেও কারো কথা বলার সাহস নেই।

এরপর আরো কিছু রাইডে চড়া হল। হঠাৎ সামনে লেখা ভূতের বাড়ি। কেউ বলল বাবা দরকার নেই, দরকার নেই। আবার কেউ বলল কি আছে চারপাশে এত লোকজন, দিনের বেলা, উজ্জল রোদ একটু দেখেই আসি না ভূতের বাড়ি।

সবাই সাহস টাহস সঞ্চয় করে দুরু দুরু বুকে ভূতের বাড়ির গেটে ঢুকল। এখন সামনে অন্ধকার ভূতের বাড়ির গেটে ঢুকল। এখন সামনে অন্ধকারে ভূতের শব্দ। একজন ভয় পেয়ে পেছন থেকে কেটে পড়ল। প্রথম ঢুকল অসম সাহসী নিশাতের আন্টি সাথে গেল আমার নাতনি। পিছে পিছে আমি নিশাত আর শতাব্দী। অন্ধকার আর ভূতের হাউ মাউ উপেক্ষা করে একটু ভিতরে যেতেই এ পাশে ওপাশে কোনায় ভূত দৃষ্টি গোচর হল। আর ভয় দেখানো কান্না হাসি। আবার কখনো মনে হয় এই বুঝি ধরে ফেলবে। ঘাড় মটকে দিয়ে বা টেনে  নিয়ে যাবে গর্তে। নিশাত ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। এক হাতে ওকে পেচিয়ে ধরলাম। এবার শতাব্দীর ভয়ার্ত চীৎকার। আরেক হাত দিয়ে ওর হাত ধরলাম। বললাম ভয় পেয়ো না আমি আছিনা সাথে? কে মানে কার কথা। আমার দু কন্যা মূর্ছা  যায় যায় অবস্থা। কোনমতে সামনে এগুচ্ছি। আরেকটু যেতে পারলেই বেরুনোর দরজা। হঠাৎ পেছনে তাকালাম দেখি আমার ঘাড়ের কাছে একটা ভূত। এবার আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম। ওদের বুঝতে দিলাম না। ভয় তাড়াতে ভূতকে দিলাম বিরাট এক ধমক। ধমক খেয়ে ভূতটি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এবার আরেকটু সামনে গেলাম। দেখি নিশাতের আন্টি একটা ভূতের সাথে হ্যান্ডশেক করছে। খালাকে পেয়ে কন্যা দুটির প্রাণে একটু সাহস হল। কোন মতে কোনমতে বেরিয়ে আসলাম। বের হয়ে এসে নিশাত কান্না জুড়ে দিল। আমার আম্মা কই? একজন বলল, তোমার আম্মাকে ভূত আটকে ফেলেছে। শুনে নিশাত দু চোখ উল্টে অজ্ঞান। তাড়াতাড়ি  যাও নিশাত এর আম্মাকে নিয়ে আস। একজন দৌড়ে গেল ভূতের বাড়ির ঢুকার গেটে। নিশাত এর আম্মা অস্তির, ভীত কণ্ঠে বলল, নিশাত কই? আগমনকারী বলল, নিশাত জ্ঞান হারাইয়া ফেলছে। ওরে আল্লারে বলে নিশাত এর আম্মা দিল দৌড়। কোথায় স্কার্ফ কোথায় নেকাব? উড়ে এসে পড়ল নিশাত এর ওপর। ও নিশাত নিশাতরে, মা আমার, কথা বল মা কথা বল।

আমি কি করব ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না। হঠাৎ খেয়াল হল জ্ঞান হারালে চোখে মুখে পানি দিতে হয়। একজনকে বললাম এই পানির বোতল দাও আমার হাতে। এবার নিশাতের মুখে পানি ছিটালাম। প্রথম বারে কোনো সাড়া নেই। দ্বিতীয় বারে একটু কেঁপে উঠল মনে হল তৃতীয় বার পানির ছিটা দিতেই বড় বড় চোখ মেলে চাইল আমার মেয়েটা। চোখ মেলেই দেখল তার মা ঝুকে আছে তার দিকে। আর যায় কোথায় গলা জড়িয়ে ধরে কান্না। এদিকে নিশাতের মাও কাদছে।

আমাদের দলের কয়েকটি মেয়ের চোখ ভিজা ভিজা। মা মেয়েতে এবার জড়াজড়ি কোলাকুলি চুমাচুমি। মেয়ে মাকে চুমা দেয়, মা মেয়েকে চুমা দেয় সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। যাক আমার বুকরে ভেতরে পাথরটা নেমে গেলো। নিশাত এর বাবাকে আমি কি জবাব দিতাম। ভদ্রলোকরে তিনটি নয়, দুটি নয়, একটি মাত্র কন্যা।

ভদ্রলোক সেদিন বেল, সফেদা, মিস্টি এসব নিয়ে হাজির। লম্বা, ফর্সা, নায়কের মত। ফেরদৌসের ভাই আরকি। আমি বললাম, দেখুন আমার বাবার ছিল ৯ সন্তান। আমার শ্বশুরের ছিল ৭ সন্তান, গড় করলে হয় ৮ সন্তান। আপনার মাত্র দুটো। এতে হবে না। আপনার মেয়ে যে গুণি, মিস্টি, এরকম সাতটা হলেও অসুবিধা নেই। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেন, ঠিক আছে কিন্তু সেদিন এখন আর নেই। আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে সাতটা না হোক পাচটা।

– আরে না কি বলেন?

– তাহলে চারটা।

– আরে না।

– ঠিক আছে তাহলে তিনটা। আমি কিন্তু এর নিচে নামব না। তিনি মিটি মিটি হাসেন।

আমি বললাম আপনি যতই হাসেন, আমি কিন্তু তিন এর নিচে নামব না। আমার মনে মনে আশা এবং ইচ্ছে আরেকটা মেয়ে হলে উনাকে একটা দিয়ে আমি আরেকটা নিয়ে আসব। বড় ছোট যেটাই দেয় আমার জন্য সাত হাজার ধন।

তিনটার নিচে নামব না মানে বিষয়টি বুঝতে পেরেছেনতো। তিনি মুচকি মুচকি হেসে বলেন, না বুঝতে পারিনি। তাহলে শুনুন, এক লোক ছিল জমিদারি মেজাজের, মানে জমিদারদের মত চলাফেরা, শিকার টিকার ও করতেন। শিকার যে করতেন তার চেয়ে গল্প করা বেশি ভালোবাসতেন। যেখানেই যেতেন তার একজন মোসাহেব রাখতেন।

তো এক মজলিসে জাঁকিয়ে বসে গল্প করছেন। মোসাহেবকে নির্দেশ দেয়া আছে গল্প করতে গিয়ে যদি অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য কিছু বলে ফেলেন তাহলে মোসাহেব কাশি দিবেন। কাশি দিলে তিনি তার বক্তব্য সঠিক করে বলবেন। তো শিকারের গল্প উঠল। জমিদার মেজাজি ভদ্রলোক সোফায় দু,পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে শুরু করলেন : সেবার সুন্দরবনে যে বাঘটা মারলাম আহা কি বলব, ত্রিশ হাত লম্বা ত্রিশ হাত লেজ। সঙ্গে সঙ্গে মোসাহেব দিলেন কাশি। তখন তিনি বললেন, না ঠিক ত্রিশ হাত নয়, বিশ হাত আরকি। বিশ হাত লম্বা বাঘ আর বিশ হাত লম্বা লেজ। মোসাহেব  আবার কাশি দিলেন। এবার জমিদার সাহেব বললেন, আরে না ওই কথার কথা আরকি। আসলে বাঘটা দশ হাত লম্বা আর দশ হাত লম্বা লেজ।  মোসাহেব আবার কাশি দিলেন। এবার জমিদার বললেন মিঞা, তুমি যতই কাশি দেও আমি এর নিচে আর নামব না।

নিশাত এর বাবা হাসতে শুরু করলেন। বললেন নিশাতকে আমি দেড় বছর পর্যন্ত কোলে করে রেখেছি। আমি বাথরুম থেকে বের হলেই দেখি মেয়ে আমার গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, হ্যা তাইতো, মেয়ে হলো বাপের কলিজা, বাপ হলো মেয়ের কলিজা। মনে মনে বলি, এমন একটা মিস্টি গুণী মেয়েকে আপনি দেড় বছর কোলে রেখেছেন, আমি হলে তো আড়াই বছর তো দুধ পান করে আরও ছমাস মোট তিন বছর কোলে কোলে রাখতাম। “কইলজার ভিতর বাইন্ধা রাইখ্খুম তোয়ারে।”

পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে এলো। নিশাত আর শতাব্দি ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরে তাকালো ভূতের বাড়ির দিকে। নিশাত কান্নাভরা গলায় বলল মা, ভূতের বাড়িতে আর কখনো যাব না। ঠিক আছে মা তাই হবে।

তার আন্টি মোবাইলে ভিডিও করে নিয়ে এসেছে। এবার দেখা যাক আমার নাতিনের অবস্থা। নাতিনকে যখন চারদিক থেকে ভূতেরা ভয় দেখাতে শুরু করল সে ভালোমতই ভয় পেল। ভয় পেয়ে ওয়ার্ত গলায় খালি ডাকে নানী নানী। এদিকে অসম সাহসী নানী ভূতের সংগে গল্প সল্প জুড়ে দিয়েছেন। এই ফাঁকে আমার নাতিন লম্বা ঠ্যাং দিয়ে ভো দৌড় দিয়ে একেবারে বাইরে। গিন্নী ভূতের সাথে হ্যান্ড শেক করে বিদায় নিয়েছেন। কালো বোরকা, কালো চশমা, হাত মোজা, পা মোজা, দেখে ভূত ও মনে হয় একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

এর ঠিক কয়েকদিন আগে আমি আমেরিকায় লস্ এঞ্জেলসে ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে এরকম (এর চেয়ে উন্নত) ভূতের বাড়ি দেখে এসেছি। সেখানে ডাইনি, রাক্ষস, কংকাল, লাশ এসব ও আছে। সাহসী লোক না হলে নির্ঘাত জ্ঞান হারাবে। সেখানে আরেকটি আইটেম বেশি। সেটা হচ্ছে শিকারি টাইপের কিছু ভূত আছে বন্দুক তাক করে ঠাস করে গুলি করে দেয়। পরে বুঝলাম বন্দুক শব্দ সবই আছে শুধু গুলিটা নেই।

আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসলো। বন্দুক নিয়ে আসলে ভয় থাকবে না। নিশাতকে বললাম, মারে আমার তো চারটা বন্দুক আছে। তাহলে সামনের বারে আমরা বন্দুক টন্দুক নিয়ে আসব। দুনলাটা আমার কাছে কাছে, একনলাটা শতাব্দীর কাছে, একটা পিস্তল তোর হাতে, আরেকটা নাতিনের হাতে।

– আন্টির হাতে বন্দুক থাকবে না?

– না তোর আন্টির বন্দুক লাগবে না সে নিজেই বন্দুক।

– মানে?

– মানে তোমার আন্টির ভয়ে সবাই থরথরিয়ে কাঁপে। দেখলা না ভূতের সাথে কেমনে হ্যান্ডশেক করে আসল?

– হ্যাঁ তাতো দেখলাম। তাহলে তুমিও থরথরিয়ে কাঁপ?

– শতাব্দী মিটিমিটি হাসছে।

– নারে মা, আমি তিরতিরিয়ে কাপি

– মানে?

– মানে বাইরে খুব সাহস দেখাই কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঠিকই কাঁপি। এটাকে বলে তিরতিরিয়ে কাঁপা।

– বাহ; বেশ মজার কথা তো।

– হ্যারে মা, আমরা বাইরে অফিসার আর ঘরে তোদের আন্টিরা অফিসার। এভাবেই চলছে রে মা।

– ঠিকই আছে, আন্টি ঠিকই আছে।

– তুই ও তোর আন্টির পক্ষ ধরলি।

– তা ধর, আমার পক্ষে কেউ নাই। আমি গরীব আসলেই গরীব। আচ্ছা শতাব্দী আর নাতিন কে কোন পক্ষে?

– শতাব্দী বলে আমি আন্টির পক্ষে, নাতিন বলে আমি নানার পক্ষে।

– ওই হলো, আমি হেরেই গেলাম। আচ্ছা ঠিক আছে, তোরা সবাই আমার জন্য দুআ করতে পারবি তো?

– অবশ্যই চিৎকার করে বলল সবাই সমস্বরে। কেপে উঠল আশে পাশের ভিজিটর রা।

ধীরে ধীরে আমরা সরে আসলাম ভূতের বাড়ির ওখান থেকে। শতাব্দি, নিশাত, আর নাতনিকে ওই ঘটনার কথা বললে এখন শুধু হাসে।

লেখক : কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (গ্রেড-১)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here