আপনারা তাঁকে পেটাবেন আর আমরা বসে বসে দেখব? দৃকের শহিদুল আলম বিষয়ে হাইকোর্ট

0
4

ঢাকা: দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলমকে চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাঁর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে হাইকোর্টে দাখিল করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিচারপতি সৈয়দ মো. দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদেশের কপি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠাতে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ড. শহিদুল আলমকে রিমান্ডে নেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশনা চেয়ে তাঁর স্ত্রী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রেহনুমা আহমেদের করা এক রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন আদালত।

রিট আবেদনকারী পক্ষে শুনানি করেন ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ড. শাহদীন মালিক, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

গতকাল শুনানির শুরুতেই ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন বলেন, ‘তিনি (শহিদুল আলম) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী। তিনি দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এই রিমান্ড আদেশ স্থগিত চাচ্ছি।’ শুনানির একপর্যায়ে আদালত বলেন, ‘উনার (শহিদুল আলম) ভাগ্য ভালো যে গুম করা হয়নি।’

এরপর ড. কামাল হোসেন শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘ড. শহিদুল খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী। তাঁর মতো একজন ব্যক্তিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ায় সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তাঁকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌক্তিক কোনো কারণ দেখাতে পারেনি। একইভাবে রিমান্ডে নেওয়ার ব্যাপারেও যৌক্তিক কোনো কারণ দেখাতে পারেনি। তার পরও রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ আদেশে বিজ্ঞ বিচারক তাঁর বিচারিক মানসিকতার প্রমাণ রাখেননি। ফলে তাঁকে দ্রুত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশনা চাচ্ছি।’ এ সময় তিনি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার এই আবেদনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা হয়েছে। এ মামলায় তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে শুনানি করবেন। তাই সময় দরকার। এ জন্য কোনো আদেশ না দিয়ে শুনানি মুলতবি রাখা হোক।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘এখানে তো তাঁর চিকিৎসার বিষয়ে কথা হচ্ছে। অসুস্থ বা আহত হলে তাঁকে কি চিকিৎসা দিতে হবে না?’ আদালত আরো বলেন, ‘ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি হাঁটতে পারছেন না।’

এ পর্যায়ে ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন বলেন, ‘আমি ওই আদালতে (ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত) উপস্থিত ছিলাম। সেখানে দেখেছি, তিনি (শহিদুল আলম) নাকে আঘাতপ্রাপ্ত। উনি হাঁটতে পারেন না। আর আমরা তো অন্য কোনো বিষয়ে এখন আদেশ চাচ্ছি না। দ্রুত চিকিৎসার জন্য আদেশ চাচ্ছি।’

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অমিত তালুকদার বলেন, ‘আগামীকাল (বুধবার) মামলার কাগজপত্র আসবে। সেগুলো আসার পর তা দেখেই আদেশ দিলে…’

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘বুঝলাম তিনি (ড. শহিদুল আলম) সাংঘাতিক রকমের কাজ করে ফেলেছেন! কিন্তু তাঁকে মারপিট করেছে কে? পত্রিকায় দেখলাম, তাঁর বক্তব্য দিয়ে সাংবাদিকরা লিখেছে তাঁকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে। আপনারা তাঁকে পিটাবেন আর আমরা বসে বসে দেখব?’

আদালত আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়েছেন, নির্যাতন না করা হলে তিনি কি মিথ্যা বলেছেন? ধরে নিলাম, তিনি মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু সাংবাদিকরা যে লিখেছেন তাঁর নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। সাংবাদিকরা কি মিথ্যা লিখেছে? আর নিশ্চয়ই তিনি দুই তলা, তিন তলার ডিগ্রি নেননি! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তাররা দেখুক। ডাক্তাররা কী বলেন সেটা দেখি। তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে কি না সেটা আমাদের দেখতে হবে।’ এরপর আদালত রিমান্ড স্থগিত না করেই তাঁকে পুলিশ হেফাজত থেকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।

আদালতের আদেশের পর ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত তাঁকে (শহিদুল আলম) দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এই আদেশের পর আশা করব, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাঁর রিমান্ড স্থগিত রাখবে।’

গত ৫ আগস্ট রাতে ধানমণ্ডির বাসা থেকে ড. শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করে পুলিশ। এ মামলায় ৬ আগস্ট তাঁকে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ আছাদুজ্জামান নূরের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চায় ডিবি পুলিশ। আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ অবস্থায় এই রিমান্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হয়। রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্রসচিব, আইজিপি, ডিবির ডিআইজি এবং রমনা থানার ওসিকে বিবাদী করা হয়েছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন ড. শহিদুল আলম। সেখানে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরতদের বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে গত ৪ ও ৫ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভে বক্তব্য দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন অনভিপ্রেত : জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রশিল্পী ড. শহিদুল আলমের স্ত্রী রেহনুমা আহমেদ কমিশন কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে লিখিতভাবে জানান যে ডিবি হেফাজতে তাঁকে (শহিদুলকে) শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে রক্তাক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন অনভিপ্রেত। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় সংবিধান, প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। শহিদুল আলমের ক্ষেত্রে উল্লিখিত নির্দেশনা অনুসরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করার জন্য কমিশন ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত সুপারিশ করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here