বাংলাদেশের স্বজন জন ম্যাককেইন

0
6

ঢাকা: কীর্তিমান রাজনীতিবিদ জন ম্যাককেইন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। গত বছরের জুলাই মাসে তাঁর মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসা চলাকালে নিজের কাজ ও ভাবনার প্রতি অবিচল ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গত শনিবার ৮১ বছর বয়সী ম্যাককেইন বিদায় নেন তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন থেকে।

দেশটির প্রভাবশালী সিনেটর, সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের সৈনিক ম্যাককেইন ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। এ কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ছেড়ে কথা বলতেন না তাঁকে।

অনেকেই হয়তো ভুলে যাননি, সিনেট ফ্লোরে দাঁড়িয়ে অসুস্থ ম্যাককেইন কিভাবে ‘ওবামা কেয়ার’ বাতিলের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। যে কারণে ভেস্তে গিয়েছিল ট্রাম্পের একটি বড় ও সমালোচিত উদ্যোগ। এমনকি মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যেন না থাকেন ট্রাম্প। সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও এক টুইটে প্রয়াত এই সিনটরের পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও শ্রদ্ধার কথা জানিয়েছেন।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে অ্যারিজোনার সিনেটরের দায়িত্ব পালন করা ম্যাককেইন ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ছিলেন রিপাবলিকান দলের প্রার্থী। অবশ্য এর আগের নির্বাচনে জর্জ বুশের কাছে দলীয় প্রাইমারিতে হেরে যান তিনি। ম্যাককেইনের বাবা আর দাদা দুজনই ছিলেন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল। আর ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ম্যাককেইন নিজে ছিলেন একজন ফাইটার পাইলট। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ধরা পড়লে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধবন্দি হিসেবে কারাগারে কাটাতে হয় তাঁকে। এর মধ্যে অন্তত দুই বছর ছিলেন একাকী একটি কক্ষে। এই সময়টায় তাঁকে নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে সাবেক ব্যাংকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক কাজি সাহিদ হাসান বলেন, ‘ম্যাককেইন ছিলেন সত্যিকারের একজন যোদ্ধা। কেননা ভিয়েনতাম যুদ্ধের সময় তাঁকে আটক করা হলেও, এক পর্যায়ে ছেড়ে দেবার কথা হয়। কিন্তু তিনি বলেন, তার আগে যাদেরকে আটক করা হয়েছে, তাদেরকে আগে ছেড়ে দিতে হবে। এমন শর্ত দিয়ে নিজের মুক্তি মেনে নেননি তিনি।

ম্যাককেইনকে পরাজিত করে প্রথমবারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বারাক ওবামা। এক শোক বার্তায় সাবেক এই প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পরও, সেই আদর্শের জায়গায় তারা দুজনই একমত ছিলেন, যে আদর্শের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমেরিকানরা লড়াই করেছে, আত্মোৎসর্গ করেছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলে থাকলেও ম্যাককেইনের অনেক দিনের বন্ধু ছিলেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আমেরিকার ওপর ম্যাককেইনের প্রভাব শেষ হয়ে যায়নি। বলেন, ‘কোনো কোনো সত্য চিরকালীন, জন ম্যাককেইনের জীবনই তার প্রমাণ।’ বাইডেন উল্লেখ করেন,  ‘ম্যাককেইনের চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহস আর সততার কারণেই তার প্রভাব থেকে যাবে অনেক দিন।’

২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ম্যাককেইনের রানিং মেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন সারাহ পেলিন। টুইটারে ম্যাককেইনের সঙ্গে নিজের একটি ছবি শেয়ার করে তিনি ম্যাককেইনকে বর্ণনা করেছেন একজন বন্ধু হিসেবে। লিখেছেন, বিশ্ব একজন ‘আসল আমেরিকানকে’ হারাল।

কাজি সাহিদ হাসান বলেন, ‘প্রথমবার জর্জ বুশের কাছে প্রাইমারিতে ম্যাককেইনের হেরে যাওয়ার পেছনে তাঁর বাংলাদেশি পালিত কন্যাকে নিয়ে একটি দুঃখজনক অপপ্রচার কাজ করেছে। নিউ হ্যাম্পশায়ারে জিতেছিলেন ম্যাককেইন। পরের প্রাইমারিতে তিনি সাউথ ক্যারোলাইনায় হেরে যান, কেবল বুশ শিবিরের সেই অপপ্রচারের কারণে। এরপরও মেয়ের কাছ থেকে ভালোবাসার হাতটি সরিয়ে নেননি একজন সত্যিকারের বাবা। এমনকি পরের নির্বাচনের প্রচারণায়ও সঙ্গী করেছেন তাকে। আর সেই নির্বাচনে বারাক ওবামার কাছে হারার পেছনের কারণ, তখন দেশ একটি বড় পরিবর্তন চাইছিল। বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে, এই পরিবর্তন সবার কাম্য ছিল। যে কারণে ওবামার বিপক্ষে জিততে পারেননি ম্যাককেইন।’

সাহিদ হাসান মনে করিয়ে দেন, জন ম্যাককেইন বাংলাদেশের কত বড় একজন স্বজন। কেননা বাংলাদেশের একটি মেয়ের বাবা তিনি। ম্যাককেইনের সাত সন্তানের একজন বাংলাদেশের।

এবিসি নিউজ জানিয়েছে, সিনেটর ম্যাককেইনের স্ত্রী সিন্ডি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সফর করেছিলেন। তখন ঢাকায় মাদার তেরেসার এক অনাথ আশ্রমে তিনি ১০ সপ্তাহের এক শিশুকে দেখতে পান। ওই শিশুর মাঁড়ি এবং ঠোঁট এমনভাবে কাটা ছিল যে সে ঠিকমতো খেতে পারতো না। তখন সিন্ডি ম্যাককেইন শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিবিসি জানিয়েছে, সিনেটর ম্যাককেইন প্রথমবারের মতো মেয়েটিকে দেখেন যখন তার স্ত্রী মেয়েটিকে নিয়ে অ্যারিজোনার ফিনিক্স বিমানবন্দরে এসে নামেন।

সিন্ডি ম্যাককেইনের একজন সহকারী ওয়েস গালেট জানান, সিনেটর সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এই শিশুটি এখন যাবে কোথায়?’ মিসেস ম্যাককেইনের জবাব ছিল, ‘কেন আমাদের বাড়িতে।’ সেদিন জন ম্যাককেইনের যে মুখটা তিনি দেখেছিলেন, তা একজন বাবার মুখ। একজন দয়ালু মানুষের।

কাজি সাহিদ হাসান বলছিলেন, সেদিনের শিশু এখন ২৭ বছর বয়সের তরুণী। সবাই যখন হারিয়েছে একজন আসল আমেরিকানকে তখন ব্রিজেট হারিয়েছেন তার বাবাকে, যে বাবা পরম মমতায় বড় করে তুলেছেন ছোট্ট সেই শিশুটিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here