ভারতে বামপন্থীদের আন্দোলন রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পরিবর্তন ঘটাতে পারে

মিতা চক্রবর্তী, কলকাতা থেকে

মহাসমারোহে দক্ষিণ ভারতের ভূতপূর্ব নিজাম-রাজ্য, বর্তমান হায়দ্রাবাদে সি পি আই (এম)এর ২২তম পার্টি কংগ্রেস সম্পন্ন হয়ে গেলো গত ১৮ এপ্রিল। উদ্বোধনী নানা অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে আর টি সি কল্যাণমন্ডপমের সামনে শহিদ বেদীতে মাল্যদান এবং পার্টির পতাকা উত্তোলনের পরে আনুষ্ঠানিক ভাবে কংগ্রেসের কাজ শুরু হয়।
“বি জে পি-কে সর্বশক্তি দিয়ে পরাভূত করতেই হবে”, মূলত এটাই ছিল এবারের পাটির্-কংগ্রেসের মূল বক্তব্য। সি পি আই (এম)এর হায়দ্রাবাদ পার্টি কংগ্রেসে খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে প্রকাশ কারাত বলেন “নয়া আর্থিক নীতি,সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতেই হবে। সেই লক্ষ্যে বি জে পি বিরোধী সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সমর্থন সংগ্রহ করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে”। অন্যদিকে সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, “চূড়ান্ত বিচারে দেশকে বাঁচানোর জন্য বিকল্প নীতিই একমাত্র সমাধান যা কেবল বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিই তুলে ধরতে পারে”। এদিনই তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে সি পি আই-(এম)এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও বি জে পি-র জনবিরোধী নীতি এবং দেশের ঐক্য ও সামাজিক সংহতি ভাঙার আক্রমণত্মক নীতির বিপদের উল্লেখ করে উক্ত মন্তব্য করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আরও বলেন “জনগণের সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে পার্টীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাতে, বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির ঐক্য মজবুত করতে ২২ তম কংগ্রেস সি পি আই (এম)কে নতুন দিশা দেবে”।

কংগ্রেস শুরুর প্রথম দিনে সভাপতিত্ব করেন পার্টীর পলিট ব্যুরোর সদস্য মানিক সরকার। তিনি বলেন “চার বছর ধরে ফ্যাসিস্ট আর এস এস নিয়ন্ত্রিত যে সরকার দেশে চলছে তা রাজনৈতিকভাবে এবং আদর্শগতভাবে গরিব মানুষের বিরোধী এবং ধনীদের স্বার্থবাহী। সাম্প্রদায়িক এই সরকারকে কোনোমতেই চলতে দেওয়া যায় না। দেশবাসীর স্বার্থে তাকে পরাস্ত করতেই হবে। বি জে পি-কে পরাস্ত করার এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদেরও পার্টি, বামপন্থী শক্তি এবং বাম-গণতান্ত্রিক মোর্চাকে শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমরা এই সংগ্রামে দেশবাসীর সমর্থন চাই। ভারতে বামপন্থীদের শক্তি কম হতে পারে কিন্তু বামপন্থীদের আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পরিবর্তন ঘটাতে পারে”।
কংগ্রেস শুরুর দিনে খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করার সময় বিগত কংগ্রেসের পরবর্তী সময়কালে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাঁচটি উদ্ভূত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে প্রকাশ কারাত বলেন,প্রথমত, পৃথিবীকে সমস্যা থেকে মুক্ত করার বদলে এই সময়কালে নয়া আর্থিক নীতির সংকট আরও তীব্র হয়েছে।দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মোড় আরও স্পষ্ট হয়েছে।তৃতীয়ত, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা কর্তৃত্ব কায়েম রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এই সময়েই সাম্রাজ্যবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব¦ বেড়েছে। চতুর্থত, কিছু দেশে বামপন্থী শক্তিগুলির আন্দোলনের তীব্রতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে তিনি নেপালের কমিউনিস্টদের সাম্প্রতিক ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন, পঞ্চমত, সমাজতান্ত্রিক চীনের উত্থান এবং পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতিতে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কারাত বলেন, গত তিন বছরে বি জে পি-র নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে দেশে কর্পোরেট পুঁজি এবং হিন্দুত্বের মধ্যে এক রসায়ন গড়ে উঠেছে। যা জন্ম দিচ্ছে স্বৈরতন্ত্রের। এরও একটি শ্রেণী অভিমুখ আছে। এই শক্তি নয়া আর্থিক নীতিতে প্রবলভাবে প্রয়োগ করছে। একই সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রসঙ্গ সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কাঠামো দখল করতে তৎপর হয়েছে। তারা একটি স্বৈরতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িক শাসন গড়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা এবং আর্থিকনীতি – এই দুইয়ের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই জারি রাখতেই হবে। এইদিনের অধিবেশন শেষে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষথেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে,বি জে পি-আর এস এস-কে পরাস্ত করার সর্বসম্মত লক্ষ্যে পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কৌশলগত লাইন নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ভিন্ন মত আছে। আন্ত:পার্টি গণতন্ত্র, বিতর্ক এবং আলোচনার শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র অনুসারে যেহেতু এই বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য পার্টিকংগ্রেসই সর্বোচ্চ মঞ্চ তাই এই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যালঘু মতাবলম্বীদের দৃষ্টিভঙ্গিও কংগ্রেসে প্রতিনিধিদের সামনে এদিন তুলে ধরেন সীতারাম ইয়েচুরি।

এবারে একটু অন্য সুরের কথায় যাওয়া যাক। একই পার্টি কংগ্রেসে, একই বিষয়ের উপরে প্রাক্তন ও বর্তমান দুই সাধারণ সম্পাদক দু’টি দলিল পেশ করেছেন। এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। সি পি এম- এ এমন নজির ঠিক কবে উপস্থাপিত হয়েছিল, তা অধিকাংশ প্রতিনিধিই মনে করতে পারেন নি। দলের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লাইন কি হবে তার উপরে জোরা দলিল পেশ হওয়ার ঘটনা যতখানি বিস্ময়ের ঠিক ততোখানিই গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনুমোদিত প্রথম খসড়াটি, প্রথমদিন বিকেলে পার্টিকংগ্রেসে আসা প্রতিনিধিদের সামনে পেশ করেছেন সি পি আই (এম)এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি।বলাবাহুল্য যে গত জানুয়ারি কলকাতায় কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় ইয়েচুরি বলেছিলেন, আমাদের দলে বিতর্কের সুযোগ আছে। তারপরে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মেনে চলতে হয়।” এই কথা থেকে খুব স্পষ্ট একটা ছবি পরিস্কার যে দলে ইয়েচুরি বনাম কারাত যুদ্ধটা একটা মস্ত বিষয় হয়ে কংগ্রেসের আগে থেকেই কাজ করে আসছিল। এবার পার্টি-কংগ্রেসের প্রধান তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংখ্যাধিক্যে পাশ হওয়া রাজনৈতিক প্রস্তাব প্রকাশ কারাত পার্টি কংগ্রেসে পেশ করেন। কিন্তু প্রথা ভেঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংখ্যালঘুদের যে মত ছিল তা পেশ করেন পার্টীর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। এই দুটি প্রস্তাবের মধ্যে মূল বিরোধের জায়গা ছিলো বি জে পি-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেস সম্পর্কে কোনোরকম বোঝাপড়া হবে কি না। সূত্র মারফত জানা গেছে,পার্টি কংগ্রেসে উপস্থিত বেশীরভাগ প্রতিনিধি সীতারামের বক্তব্যের সমর্থনে জোরালো সওয়াল করেন এবং প্রায় ১১৬ টি রাজ্যের নেতৃত্ব রাজনৈতিক প্রস্তাবের ওপর গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণের দাবী জানান। প্রকাশ কারাত এবং তার অনুগামীরা বুঝতে পারেন যে কংগ্রেসে উপস্থিত অধিকাংশ প্রতিনিধিদের যা মনোভাব, তাতে ভোট হলে তাঁর প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাবে। তখন ঐক্যমতের প্রশ্নটি সামনে আসে এবং ঐক্য-সূত্র হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির গৃহীত প্রস্তাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করা হয়।
প্রসঙ্গত আরো বলা দরকার যে রাজনৈতিক লাইন সংক্রান্ত তিনটি সংশোধনী ২০.০৪.১৮ তারিখে গৃহীত হয়েছিল। সেগুলি হলো-প্রথমত, খসড়ায় থাকা ২.৯০ অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, খসড়ায় ২.১১৫ (২)অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় বাক্য বাদ দেওয়া হয়েছে। তার বদলে অন্য বাক্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। খসড়ায় এই অনুচ্ছেদে ছিল “সুতরাং, প্রধান কর্তব্য হলো সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমবেত করে বি জে পি ও তার মিত্রদের পরাস্ত করা। যদিও, এই কাজ করতে হবে কংগ্রেস দলের সঙ্গে কোনোরকম সমঝোতা বা নির্বাচনী আঁতাত না করে”। এই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় বাক্য,অর্থাৎ -“যদিও, এই কাজ করতে হবে কংগ্রেস দলের সঙ্গে কোনোরকম সমঝোতা বা নির্বাচনী আঁতাত না করে”-এই বাক্যটি বাদ যাচ্ছে। তার বদলে অন্তর্ভুক্ত হবে, “কিন্তু, এই কাজ করতে হবে কংগ্রেস দলের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক আঁতাত ছাড়া”।

সি পি আই (এম)এর ২২ তম পার্টি-কংগ্রেসের খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে মোট ৮১৭৮ টি সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছিল। কংগ্রেসের দু’মাস আগে থাকতেই এই খসড়া পার্টির সর্বস্তরে আলোচনার জন্য পেশ করা হয়েছিল। সারা দেশ থেকে উক্ত সংশোধনীগুলি এসেছিল। উল্লেখ্য, পার্টি-কংগ্রেসের ইতিহাসে এইবারের সংশোধোনীগুলি সর্বোচ্চ সংখ্যক। কংগ্রেসের প্রথম দিনেই প্রাক-কংগ্রেস সংশোধনীর রিপোর্ট পেশ করেন প্রকাশ কারাত। আন্তর্জাতিক বিষয়ে সংশধোনী ছিল ৮৯৩ টি। তারমধ্যে বেশ কিছু ব্রাজিল, এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়ার সর্বশেষ ঘটনাবলী সম্পর্কিত সংশোধনী ছিল। এগুলি গৃহীত হয়েছে। গৃহীত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে আসা শরণার্থী স্রোত এবং অভিবাসী-বিরোধী জাতিবিদ্বেষ সংক্রান্ত সংশোধনী। এছাড়াও কৃত্রিম মেধা, উৎপাদনে তার প্রভাব, তথ্য পাচার, বাণিজ্য সংঘাতের মতো বেশ কিছু বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে এই কংগ্রেসে। আলাদা করে যে কথাটি বলতেই হয় যে জাতীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ৬৯২৪ টি প্রাক-কংগ্রেস সংশোধনী ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, রাজনৈতিক লাইন সংক্রান্ত সংশোধনীই ছিল বেশী। এরমধ্যে সংশোধনী এবং প্রস্তাবের আকারে বেশ কিছু বিষয় গৃহীত হয়েছিল। মোদি সরকারের কাজের মধ্য দিয়ে এবং বি জে পি-আর এস এস-এর তৎপরতায় ফ্যাসিবাদি শক্তি যে ধেয়ে আসছে সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকাশ কারাত বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করছে না। কিন্তু তিনি স্বীকার করেন যে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে রাজ্যস্তরে যৌথ তৎপরতা দেখা দিলেও, এমন জোটের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে কারাত জানান।
অন্যদিকে ইয়েচুরিও যা বলেছেন, তা এইরকম, তিনি সরাসরি বলেন, “কংগ্রেস দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট বা মোর্চা গঠনের কোনো সম্ভাবনা নেই। আমাদের পার্টির ইতিহাস তো সেই কথাই বলে। ১৯৯৬ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারই হোক অথবা ২০০৪ সালের ইউ পি এ সরকার, আমরা তাদের বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছি। এই বাইরে থেকে সমর্থনের প্রক্রিয়াটির কোনো বৌদ্ধিক স্বত্ত্ব¡াধিকার থাকলে তা আমাদেরই প্রাপ্য। এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, তা হলো আগামী নির্বাচনে দল বাম প্রার্থীদের সমর্থনের ডাক দেবে। কিন্তু যেখানে বাম প্রার্থী থাকবে না, সেখানে কংগ্রেস ছাড়া আর অন্য কোনো দলকে সমর্থন করার সুযোগ যখন নেই,তখন সি পি আই (এম)কি করবে? বি জে পি-কে পরাস্ত করতে পাটির্ কোন দলকে কাছে টানবে? সেক্ষেত্রে ইয়েচুরির কথাই কিন্তু প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, কংগ্রেস দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন না করা হলেও নির্বাচনের সময় কোনও বোঝাপড়ার সুযোগ থাকবে কি না তা নিয়ে দলে আলোচনার সুযোগ থাকবে।

নব কলেবরে প্রস্তাবিত সেন্ট্রাল কমিটি এবং সেন্ট্রাল কন্ট্রোল কমিশনের চিত্রটি এই রকম – ৭৫ জন আগের সদস্য ছাড়াও ২০ জন নতুন সদস্য কমিটিতে এসেছেন। আজীবন সদস্য দুইজন। তাঁরা হলেন রাজীন্দর নেগী, সম্পাদক উত্তরাখন্ড রাজ্য কমিটি এবং সঞ্জয় পারাতে, সম্পাদক ছত্তিশগড় রাজ্য কমিটি। বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়েছেন ভি এস অচ্যুতানন্দন, মাল্লু, স্বরাজয়ম মদন ঘোষ, পালোলি মহম্মদ কুট্টি,পি রামাইয়া এবং বরদারাজন। সেন্ট্রাল কন্ট্রোল কমিশনে যারা আছেন তাঁরা হলেন, বাসুদেব আচারিয়া,পি রাজেন্দ্রন, এস শ্রীধর, জি রামালু এবং বনানী বিশ্বাস।
কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে সি পি আই-এর সাধারন সম্পাদক সুধাকর রেড্ডি বলেন, “বি জে পি সরকারকে উৎখাত করাই মূল লক্ষ্য আমাদের। এই মুহূর্তে বি জে পি-ই দেশের মানুষের প্রধান শত্রু। কারণ আর এস এস ফ্যাসিস্ট উদ্দেশ্য নিয়ে মোদি সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঠুঁটো করে দিচ্ছে, ত্রিপুরা নির্বাচন এবং গোয়ায় বি জে পি যেভাবে সরকার তৈরী করেছে কিংবা বিচারব্যবস্থায় যেভাবে হস্তক্ষেপ করছে তার থেকে এটা স্পষ্ট। এই আক্রমণকে প্রতিহত করতে হলে বামপন্থীদের ঐক্য এবং ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির বৃহত্তর ঐক্য দরকার”।

সি পি আই (এম) লিবারেশনের সাধারন সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছেন “স্বাধীনতার পরে কখনো এমন পরিস্থিতি দেশে তৈরী হয় নি। সাংবিধানিক প্রতিটি ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদীদের যে আক্রমণ চলছে তা ফ্যাসিবাদের থেকে একচিলতেও কম নয়। ময়দানের লড়াইতেই তাকে পিছু হটাতে হবে। তার জন্য একটা শক্তিশালী বামপন্থী প্রতিরোধ দরকার। রাস্তার এই লড়াইতে বামপন্থীদের ঐক্য এবং তার সঙ্গে দলিত আন্দোলন যুক্ত হলে ফ্যাসিবাদকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা যাবে”।
সি পি আই (এম)এর ২২তম কংগ্রেস তখন শেষের সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডিয়ামের চেয়ারম্যান মানিক সরকার দ্বিতীয়বার নির্বাচিত সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে আহ্বান জানালেন বক্তব্য রাখার জন্য। চারমিনারের আদলে তৈরী পোডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়ালেন দ্বিতীয়বার নির্বাচিত সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি।

তিনি বলেন “সামনে বড় লড়াই। দেশে আর এস এস-বি জে পি-এর শাসন চলছে। সংসদীয় গণতন্ত্র আক্রান্ত। সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সামনে মারাত্মক বিপদ হাজির হয়েছে আর এস এস-বি জে পি। দেশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জুনিয়র পার্টনার করে তুলতে চাইছে বি জে পি। আমরা তা হতে দিতে পারি না। পার্টি কংগ্রেস আমাদের সামনে যে নির্দেশিকা হাজির করেছে, তার ভিত্তিতে আমাদের উদ্দীপ্ত সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। মানিক সরকার আরও বলেন “অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে কংগ্রেসে। খোলামেলা আলোচনা করেছেন কমরেডরা, অথছ সংবাদমাধ্যম আমাদের কংগ্রেস নিয়ে যা খুশি তাই লিখছে, বলছে। আমাকে ত্রিপুরা থেকে পার্টি কর্মীরা ফোন করে জানিয়েছেন, কংগ্রেস শুরুর দিনের বিবরণেই লেখা হয়েছে যে এখানে নাকি মারামারি হচ্ছে। কী বলা যায় একে? সারাদেশেই এমন কুৎসা হয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের পার্টিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, আন্দোলন সংগ্রামকে তীব্র করতে আলোচনা করেছি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি”।এখানে বলা দরকার, “কুৎসা” বলে বিরোধীদের বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের একটা বাঁধা গৎ। মানিকবাবুদের এমন মানসিকতা বর্জন করা আবশ্যিক কর্তব্য। তাতে পার্টির মঙ্গল।

এতক্ষণ তো ছিল একরকম। এবার প্রকাশকে ছেড়ে বৃন্দার কথায় আসি।
পার্টি-কংগ্রেসে তো কারাতকে হারিয়ে সীতারাম ইয়েচুরির রাজনৈতিক লাইন জয়ী হয়েছে। কংগ্রেসের প্রকাশ্য সমাবেশে বি জে পি-কে মূল নিশানা করেও ইয়েচুরি সব তিক্ততা সরিয়ে দলে ঐক্যর ডাক দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কি দলে ঐক্য ফিরবে? কারন পরাজিত কারাত শিবিরের পক্ষে ঘুরে দাঁড়াতে কংগ্রেস চলাকালীন বৃন্দা কারাত অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেল “দখল” করে নিয়েছিলেন। বৃন্দার নির্দেশেই নাকি কংগ্রেস শুরুর দিন থেকে এই টূইটার হ্যান্ডেলে একের পর এক কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে টুইট করা হয়েছিল। পার্টি কংগ্রেসে ইয়েচুরির রাজনৈতিক লাইন অনুযায়ী বি জে পি-কে রুখতে কংগ্রেসসহ সব ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সঙ্গে জোটের দরজা খুলে যায় বললেই চলে। কিন্তু সূত্রের খবর, এই পরাজয় মানতে না পেরে কংগ্রেস শুরুর দিন থেকেই ‘সি পি এম স্পিকস’ নামে গোপালন ভবনের এই অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেলে কংগ্রেস দল বিরোধী এমন সব টূইট আসতে থাকে যা দেখে অনেকেরই মনে হয়েছিল যে কেন্দ্রে যেন এখনও কংগ্রেস দল ক্ষমতায় আছে। আগামী লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করাই যেন গোপালন ভবনের মূল লক্ষ্য। ২০ এবং ২১ তারিখে পর পর দুদিন এই টুইটার হ্যান্ডেল থেকে একটানা আটটি টুইট করা হয়েছিল। প্রতিটি টুইটের মোদ্দা কথা ছিল একটাই, সি পি এম-এর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হওয়ার কোনো সুযোগের কথা পার্টি-কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে নেই। বৃন্দা বেশ সুকৌশলেই সাংবাদিক বৈঠক করে ‘বিভ্রান্তি’ ছড়িয়েছেন বলে অভিযোগ।

সি পি এম সূত্রের খবর, অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেলের দায়িত্বে সি পি এম-এর সোশ্যাল মিডিয়ার যে টীম রয়েছে,তাদের উপর বৃন্দা প্রবল চাপ দিয়েছিলেন। ২১ তারিখ গভীর রাতেও বৃন্দা দফায় দফায় ফোন করেছেন সেইসকল সি পি এম কর্মীদের। বৃন্দার নির্দেশেই নাকি সি পি এম-এর সাথে কংগ্রেসের সাথে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই বলে বার বার টুইট করা হয়েছে। গোপালন ভবন সূত্রের খবর, কারাত শিবিরের উদ্দেশ্য, সীতারামের ‘লাইন’ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। যাইহোক, সি পি আই এম-এর ২২তম কংগ্রেস শেষ হলেও কারাত আর ইয়েচুরি শিবিরের রাজনৈতিক লাইন নিয়ে ঝগড়া কিন্তু শেষ হলো না। বরং বলা যায় আবার নতুন করেই দুটি শিবিরের দ্বন্দ্ব দলের ভিতরে এবং বাইরে সমানে কাজ করে যাবে। তারই পূর্বাভাস বহন করেছে এইবারের পার্টি কংগ্রেসের যাবতীয় ঘটনা-পরম্পরা।
এতোসবের মধ্যেও যে কথাটি খুব খুব আনন্দের তা হোলো, পার্টি কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে সর্বশেষ কোনো বক্তব্য নয়, ইয়েচুরি গেয়ে উঠেছিলেন “ অ্যাট দা কল অফ কমরেড লেনিন……”। সত্যিই ইয়েচুরির উদ্দেশ্যে বলতেই হয়, শাবাস, হ্যাটস অফ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here