লজ্জাই যে নেই ডাউন দ্য উইকেট

0
10

স্পোর্টস ডেস্ক: তাঁরা খুব আপসেট, বিষণ্ন এবং ক্ষুব্ধও। এভাবে কেউ লিখে দেয়! দৈনিক কালের কণ্ঠ’র খেলার এক পাতাজুড়ে ক্রিকেটারদের কাণ্ডকীর্তির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া যে খেলোয়াড় মহলে এমনটা হবে, তা জানাই ছিল। তীব্র ক্রিকেট অনুসারীদের কারো কারো মনেও এর সামান্য প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। ক্রিকেটারদের তাঁরা বিনা শর্তে সমালোচনার ঊর্ধ্বে বসিয়েছেন। তাই ক্রিকেটারদের খেলার সমালোচনা করা যাবে না। সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়লেও উপেক্ষা করতে হবে, তাঁরা যে সেলিব্রিটি! একবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টক শোতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককেও বলতে শুনেছি যে, প্রতিভাবানদের একটু-আধটু এমন সমস্যা তো থাকতেই পারে। যাঁদের আদর্শ মেনে একটি প্রজন্ম নিজেকে তৈরি করে, তাঁদের নাকি টুকটাক সমস্যা থাকাটা অন্যায় কিছু নয়।

হুম, টুকটাক সমস্যা না হয় ধর্তব্যের বাইরে রাখা গেল। কিন্তু সে সমস্যাগুলো যদি ক্যান্সারের মতো সংক্রমিত হতে থাকে, তাহলে? ‘ক্যান্সার’ শব্দটিই ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আর ক্যান্সার পুরোপুরি নিরাময় না হোক অন্তত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তো পুরো একটি সমাজের ধ্বংস অনিবার্য। ক্রিকেটের অন্ধপ্রেমিকরাও কিন্তু সে সমাজেরই অংশ। যাক, বাস্তবতা হচ্ছে এক দুই করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রিকেটার অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন, যা উদ্বেগজনক মনে হয়েছে ক্রিকেট প্রশাসকদের কাছেও। আশা করা যায় এর প্রতিকারের ব্যবস্থাও তাঁরা নেবেন। অবশ্য শাস্তি পেয়েও তো এক ক্রিকেটার নিয়ম করে নিয়ম ভেঙে গেছেন। সে কারণেই এবার আরো কঠোরতর শাস্তির চিন্তাভাবনা করছে বোর্ড।

যদিও কেলেঙ্কারি কিংবা বিশৃঙ্খলার খবর প্রকাশ হয়ে পড়া কিংবা বোর্ডের তরফ থেকে সতর্কবার্তা গায়েই মাখেন না ক্রিকেটাররা। অভিভাবকের বকুনি না হয় গায়ে সয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু মিডিয়ায় কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশিত হলে কি সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না ক্রিকেটাররা? হন নিশ্চয়ই, কেউ কেউ তো বটেই। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করলে সেটা আর বিশ্বাস হয় না। একজন ক্রিকেটার একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে গেছেন, শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু তাঁর আচরণে এর সামান্যতম প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয়নি। অনুশোচনার লেশমাত্রও দেখা যায়নি। বিস্ময়কর নার্ভ দিয়ে সব সামলে নিয়েছেন তিনি। পুরো দল যখন গায়ানায় ওয়ানডে জয়ের পর সেলিব্রেশনে ব্যস্ত, তখন তিনি চুপিসারে গ্যালারির দিকে ছুটেছেন স্থানীয় এক তরুণীর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হতে। অথচ এই নার্ভ যদি মাঠে ধরে রাখতে পারতেন…।

গ্যালারিতে কিংবা হোটেল লবিতে তরুণী ভক্তের সমাগম নতুন কিছু নয়। এটা ঠিক যে এ জাতীয় সমাবেশ এখন বহুগুণ বেশি। তবে অতীতেও ছিল। অতীতেও বিভিন্ন ক্রিকেটারের কেচ্ছাকাহিনি কানে এসেছে। তবে এখনকার মতো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো করে নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে মিডিয়ায় সাবেক এক ক্রিকেটারের জ্বালাময়ী প্রতিক্রিয়া দেখে তাই মুখ টিপে হেসেছেন অনেকে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও যে মহামানবের নয়! তবে অপ্রকাশিত প্রেমকাহিনি তো সমালোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে না। সমালোচনার খোরাক জোগায় প্রকাশিত কেলেঙ্কারি। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এই পার্থক্যের সাদামাটা কারণ একাধিক—

১. আগেকার ক্রিকেটারদের গমনাগমন ছিল সমাজের উঁচুতলায়। একটু-আধটু প্রেম তাই প্রকাশ্য হতো না। তাঁরা যথেষ্টই সচেতন এবং ‘রুচিশীল’ও ছিলেন। আর এখনকার ক্রিকেটারদের প্রেমের পরিধি সুবিস্তৃত। কার সঙ্গে ডেট করছেন না করছেন, ঠিক-ঠিকানা নেই। মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে একঝাঁক ভক্ত বসেন, যাঁদের নিয়ে ড্রেসিংরুমে উদ্দাম আলোচনা হয়। তো এঁদের একজনের সঙ্গে চোখাচোখি থেকে ফোন নম্বর বিনিময়ের পরই ‘ডেটিং’ শুরু। এ রকম একটি ঘটনার সূত্র ধরে এক ক্রিকেটার নিদারুণ হেনস্তা হয়েছেন। যদিও তাঁর সেই বান্ধবীর ঠিকুজি ড্রেসিংরুমের আরো অনেকেরই জানা!

২. প্রভূত প্রচারণা আর অফুরন্ত উপার্জন আরেকটি কারণ। মিডিয়ার কল্যাণে একালের জাতীয় দলে ডাক পাওয়া ক্রিকেটারেরও সব খবর জানে এ প্রজন্ম। বিস্তর উপার্জনের কারণে বান্ধবীর সঙ্গে ডেট করার খরচ জোগানো নিয়েও ভাবতে হয় না কোনো তরুণ ক্রিকেটারকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাত বাড়ালেই মিলে যাচ্ছে বান্ধবী—জাতীয় ক্রিকেটার হওয়ার আগে যাঁদের কাছে এমন মুফতে বান্ধবী জুটিয়ে ফেলা ছিল স্রেফ আকাশকুসুম কল্পনা। আর সেসব বান্ধবীর বড় অংশের মোহ ক্রিকেটারের খ্যাতির আলোয় নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়া। অন্তত দুজন ক্রিকেটার এমন ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন। আরো কেউ কেউ একই ভুল করেছিলেন, তবে তাঁরা পার পেয়েছেন রফা করে।

এবং ৩. মিডিয়া। গুটিকয় টিভি চ্যানেল বাদ দিলে রুবেল হোসেন থেকে শুরু করে মোসাদ্দেক হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি খেলার পাতায় জায়গা পায়নি। একেবারে ব্যক্তিগত এবং আইন আদালতের ব্যাপার—এমন যুক্তিতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া অযৌক্তিকও নয়। তবে কেলেঙ্কারি মহামারি আকার নেওয়ায় বোধকরি দিন বদলেছে। মিডিয়ার ‘নিষ্ঠুরতা’য় যদি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়!

এটা এখন সময়ের দাবি। ২০১৫ সাল থেকে একের পর এক ক্রিকেটারের নারী কিংবা শিশু নির্যাতনের অভিযোগে জেলে যাওয়ার ঘটনাও ক্রিকেটবিশ্বে বিরল। একজন পাওলো রসিকে উদাহরণ হিসেবে টেনে এ লজ্জা আড়ালের কোনো সুযোগ নেই। পাওলো রসির কথা মনে আছে তো? জেল থেকে বেরিয়ে ইতালিকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে। বাংলাদেশের তিন ক্রিকেটার ভিন্ন ভিন্ন কারণে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে জেল খেটেছেন গত তিন বছরে। আরেকজন ফৌজদারি ঝামেলা থেকে বেঁচে গেছেন বোর্ডের অপরিসীম কর্মতৎপরতায়। গর্ভবতী স্ত্রীর পেটে লাথি মেরে অনাগত সন্তানকে ‘হত্যা’র অভিযোগ শোনা গিয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। যে খবর অন্যদের মতো প্রকাশিত হয়ে পড়েনি। তবে ‘অফ দ্য কোর্ট’ সে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলাতেই নাকি চৌদ্দ শিকে বন্দি হতে হয়নি ২০১৬-র বিপিএল মাতিয়ে জাতীয় দলের সঙ্গে নিউজিল্যান্ড সফর করে ফেলা সেই ওপেনারকে। কী নিষ্ঠুর!

ক্রিকেটার বলেই তাঁদের মনোবেদনা আরো বেশি। একের পর এক কেলেঙ্কারির খবরে ক্রিকেটার মানেই চরিত্রহীন—এমন একটা ভাবমূর্তির সংকটে দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররাও। অতীতে এঁদের কে কী করেছেন জানি না, তবে মাশরাফি বিন মর্তুজা, তামিম ইকবাল, মাহমুদ উল্লাহ, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তির নয়। তাঁরাও ক্রিকেটার। মাঠে জুনিয়রদের ম্রিয়মাণ নৈপুণ্য তাঁদের যতটা ব্যথিত করে, তার চেয়ে বহুগুণ উতলা তাঁরা সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে। ওই যে, ক্রিকেটার সমাজে কলঙ্কের দাগ পড়ার ব্যাপারটা।

অনেক খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, এঁদের হাতে প্রতিকার নেই। তাঁরা যতই দলের পাণ্ডা হন না কেন, ম্যাচ কিংবা প্র্যাকটিসের পর উদ্দাম তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করা তাঁদের সাধ্যের বাইরে। মনে তাঁদের অজানা আশঙ্কা, কিছু বললে যদি পাল্টা শুনিয়ে দেয়!

সেদিন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কে নাকি ফোন করে ক্ষোভ জানিয়েছেন যে ক্রিকেটারদের এতসব কেচ্ছাকাহিনি কেন রুখতে পারছেন না তাঁরা? অভিভাবক হিসেবে তো দায় বোর্ডেরই। অভিযোগ আংশিক সত্য। নারীঘটিত কিংবা শৃঙ্খলাজনিত পূর্বের অপরাধগুলো শক্তহাতে দমন করলে হয়তো সেসব এমন মহামারির আকার নিত না। আবার বোর্ড যে একেবারে ব্যবস্থা নেয়ইনি, সে অভিযোগও তো করা যাচ্ছে না। একাধিক ক্রিকেটারের সাজা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে মহাতারকাও রয়েছেন। তবু ঘটনাপ্রবাহ থামছে না। হতে পারে, বোর্ড আরো কঠোরহস্ত হলে অন্তত ‘ক্যান্সার ম্যানেজমেন্ট’টা করা যেত। সাব্বির রহমানের শাস্তি হলো। কিন্তু ঠিকই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেললেন তিনি। তাতে কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে যে আর্থিক ক্ষতি তাঁর হওয়ার কথা সেটি আর হয়নি। জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে গ্রেডিং অনুযায়ী মাসিক বেতন তিনি ঠিকই পেয়েছেন। আর বিসিবির ধার্য করা আর্থিক জরিমানা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। শাস্তির অর্থ বিসিবি কবে শেষ আদায় করেছে, সেটি কেউ জানে না যে! এ কারণে বিসিবির অধিকাংশ শাস্তিই লোক-দেখানো কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।

তবে দায় শুধু বিসিবির কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমের নয়। সিংহভাগ দায় ক্রিকেটারের। আর যাঁর দায়, তাঁকে তো শোধরাতে হবেই। তা যে উপায়েই হোক না কেন। শাস্তি দিয়ে বোধশক্তি ফিরিয়ে আনা কি যাবে? মনে হয় না। আর্থিক ক্ষতি ছাড়া আর কোনো শাস্তিকে যে গোত্র সাজা বলে গণ্যই করে না, তাদের এভাবে শুধরে ফেলাও কঠিন। অপকীর্তি ফাঁস হয়ে যাওয়ার লজ্জাবোধটাই যে নেই তাঁদের!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here