‘ট্রাম্পের ওপর বিন্দুমাত্র আস্থাও রইল না আর’ মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা

0
10

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: আড়াই যুগ আগে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের হাতে হাত মিলিয়ে দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ রকম কোনো দৃশ্য যেন কল্পনাই করতে পারেন না। বরং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থেকে তিনি যেন একেবারে ছিটকে পড়েছেন।

পাকা ব্যবসায়ী হলেও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ব্যাপারে ট্রাম্পকে একেবারে নবিশ হিসেবে দেখেন পর্যবেক্ষকরা। তার পরও তিনি ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি গত বছর মে মাসে বলেছিলেন, ‘সত্যি বলছি, লোকে এত বছর ধরে যেটাকে খুব কঠিন বলে ভেবে এসেছে, ব্যাপারটা আসলে সম্ভবত অতটা কঠিন নয়।’ এমন মন্তব্য করার এক বছরের বেশি সময় পার করে গত সপ্তাহে তিনি স্বীকার করে নেন, ‘সারা জীবন ধরে আমি শুনে এসেছি, এ (ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি) চুক্তি করা সবচেয়ে কঠিন। আর এখন আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, এটাই সম্ভবত সত্যি।’ সেই সঙ্গে তিনি অবশ্য এটাও বলেছেন, চুক্তি করার ব্যাপারে তিনি এখনো আশাবাদী।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ দুই মন্তব্য করার মাঝখানে অনেক কিছু ঘটিয়ে ফেলেছেন। গত বছর ডিসেম্বরে তিনি গোটা জেরুজালেমকে একতরফাভাবে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ফিলিস্তিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো তোয়াক্কাই তিনি করেননি। ওই স্বীকৃতির বাস্তবায়নে তিনি এ বছর মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ইসরায়েলের তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে আনেন।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিন মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে একেবারে নাকচ করে দেয়। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস স্পষ্ট ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যস্থতা তাঁরা আর মানেন না।

এরপর ফিলিস্তিনকে শায়েস্তা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের অর্থ সহায়তা প্রদান একেবারে বন্ধ করে দেন। ফিলিস্তিনি নেতাদের আরো চাপের মধ্যে ফেলতে গত সোমবার ওয়াশিংটনে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) মিশন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এত কিছু করার পেছনে ট্রাম্পের একটাই যুক্তি, ‘বল প্রয়োগ করে শান্তি’ আনতে চান তিনি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, সেটা কি আদৌ আর সম্ভব? কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক মিশেল ডুন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করে বসে আছেন, ফিলিস্তিনিদের বোঝানো সম্ভব যে তারা সব কিছু হারিয়েছে এবং সামনে যা পাবে, সেটাই তাদের গ্রহণ করতে হবে। সেটা হতে পারে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধাসহ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার।’ ডুনের ধারণা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুটা আলোচনার টেবিল থেকে একেবারে সরিয়ে ফেলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এ ইস্যুর সঙ্গে শুধু ফিলিস্তিনিরা নয়, অন্য অনেক আরব ও মুসলিমরাও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং ‘ফিলিস্তিনিরা এভাবে বিষয়টা মেনে নেবে, তেমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে’, বলেন ডুন।

ফিলিস্তিন যে এখন আর ট্রাম্পকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখতে চায় না, তাতে একটুও বিস্মিত নন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা আরন ডেভিড মিলার। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনের হয়ে মিলার মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সমঝোতাকারী হিসেবে একসময় ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে তিনি ওয়াশিংটনের বিশ্লেষক সংস্থা উইলসন সেন্টারের প্রগ্রাম ডিরেক্টর। তিনি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সৎ ছিল না। এ ব্যাপারে তাঁর ভাষ্য, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমরা কখনো সৎ হতে পারিনি।’ তার পরও আগে একটা সময় পর্যন্ত মধ্যস্থতা করার মতো অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল। কিন্তু এখন আর সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের প্রতি অতিমাত্রার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আগে কখনো কোনো প্রশাসনকে ইসরায়েলের প্রতি এত অস্বাভাবিক পক্ষপাতিত্ব করতে এবং পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের প্রতি এতটা শত্রুভাবাপন্ন হতে দেখিনি আমি।’

ইসরায়েলের প্রতি চরম পক্ষপাতিত্বের জেরে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে মিলারের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এমন একটা প্রস্তাব উত্থাপন করবে, যাতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে পাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে ফিলিস্তিন। আর ফিলিস্তিন যাতে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, সে লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে, এমনটা মনে করেন গবেষক ডুন। তাঁর মতে, ফিলিস্তিন পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে পাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে এ কারণকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আরো বেশি করে ইসরায়েলের পক্ষে ঝুঁকবে এবং পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের জিম্মায় দিয়ে দেবে। আর এসব ঘটনা ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া বলে আর কিছু থাকবে না।

সূত্র : এএফপি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here