শেষ নাহি যে.. : সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে স্মৃতিচারণ

মিতা চক্রবর্তী, কলকাতা থেকে ,

স্মৃতি ভীষণ বেশী লাগামছাড়া। এই মাসটাতে সুচিত্রাদি, সুচিত্রা মিত্র, আমাদের দিদির নানা কথার ভীড় মনকে কখনো কাঁদায়, কখনো আবেগমথিত করে তোলে, কখনো দুঃখে আবার কখনো বা আনন্দে আমার মন আমাকে উতলা না করে পারে না। আজ যে সব শুধুই স্মৃতি, সেই স্মৃতির প্রেক্ষিত থেকেই, দিদিকে আবর্তিত হয়ে যে যে কথা মনে পড়ছে, তাই নিয়েই এই স্মৃতিচারণ।

সুচিত্রা মিত্র

১৯২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, পরাধীন ভারতের, তদানিন্তন বিহার রাজ্যে, ট্রেনের ক্মারায়, গজান্ডি স্টেশনে, রবীন্দ্র সংগীতের কিম্বদন্ত ী শিল্পী সুচিত্রা মুখোপাধ্যায়ের জন্ম। সেই কারণেই তার ডাক নাম ছিল গজু।
জন্মলগ্ন থেকেই তিনি অতুলনীয়া। রূপ, গুণ ছাড়াও আর সবেতেই তাঁর তুলনায় তাঁর নামই মনে পড়ে। ১৯৮০ সালের কোনো একদিনে দিদির সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তখন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্নাতক স্তরে সমাজতত্বের (সোশিওলজি) ছাত্রি। মায়া সেনের কাছে গান শিখি। মায়াদি তখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষিকা। সুচিত্রাদি ছিলেন বিভাগীয় প্রধান। গানের সঙ্গে বিশেষ করে রবীন্দ্র সংগীতের সঙ্গে আমার আবাল্য-সখ্যতা। যার ধার ও ভারের কাছে আমি সততই নতজানু। এই সবেরই জন্য বা কারণে আমার মায়ের প্রেরণা, আনুকূল্য, প্রচেষ্টা ইত্যাদি ছিল অতুলনীয়। তাই বাবার শত অনিচ্ছা সত্বেও বি এ পাশ করার পরে, সমাজতত্ব নয়, রবীন্দ্র সংগীত নিয়েই আমি এম এ পড়েছিলাম, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

খানিকটা লুকিয়েই (বাবাকে) মায়াদির ইচ্ছায় আমি এম এ পড়ার জন্য ফর্ম তুললাম। মা বলেছিলেন “ভয় পাস না, আমি তো আছি”। একটা নির্দিষ্ট দিনে আমার ইন্টারভিউ-এর চিঠি এলো। মায়াদির কাছে শুনেছিলাম ইন্টারভিউ বোর্ডে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে সুচিত্রাদি তো থাকবেনই। সাথে একজন বাইরের থেকে এবং বিভাগেরও একজন, মোট তিনজন পরীক্ষক থাকবেন। আমার স্বপ্নের সিঁড়ির অথবা স্বপ্নালু ইচ্ছের প্রথম ধাপে পা রাখার সুযোগ পেয়ে তখন আমি একেবারেই দিশেহারা।
একের পর একজনকে ইন্টারভিউ নেবার জন্য ডাক পড়ছে। আমার তো ভয়ে হৃদকম্পন প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। সুচিত্রা মিত্রের সামনে পারবো তো ঠিকঠাক গান গাইতে? এই একটাই প্রশ্ন আমাকে পাগল করে তুলছিল। অবশেষে আমার ডাক পড়লো। বাপ রে, সে কি ভয়, আজও তা এতোটুকুও ভুলিনি। মায়াদি একটা কঠিন তালের, স্বল্প পরিচিত গান শিখিয়ে দিয়েছিলেন। ঘরে ঢুকতেই সুচিত্রাদি বললেন “তুই মায়ার ছাত্রী?” বললাম, হ্যাঁ। একগাল স্বস্নেহ হাসি হেসে বললেন “গা”। ওনার কোমল চাহনি দেখে তখন অনেকটা ভয় কমে গিয়েছিল। আমার আগে আগে যারা গিয়েছিল, প্রায় সকলেই সকলের অভিজ্ঞতা বলেছে, আর আমরা বাইরে যারা অপেক্ষায় ছিলাম, হাঁ করে সব কথা যেন গিলেছি। কেউ কেউ বলেছিল প্রথম টুকু শুনে আর কিছু বলেন নি। আবার কেউ কেউ প্রথম অন্তরা অব্দি গেয়েই ছাড়া পেয়েছে। আমি তো ভাবলাম, যাক, দুই লাইন শুনেই যদি আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলেই মঙ্গল। ওমা, পরীক্ষকেরা আমার গান সবটাই শুনলেন। আমি তো অবাক! সুচিত্রাদি বললেন “আয়”। বাইরে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না! আনন্দের কান্না। কেন? না দিদি আমার গান সবটুকুই শুনেছেন তাই। সেদিন ওখান থেকেই চলে এসেছিলাম। মায়াদিকে বিকেলে ফোন করে বললাম কি হলো,কেমন হলো সব। দিদি বললেন “তুমি খুব ভালো গেয়েছ”! আমি তখন আর নিজেকে সামলাতে পারছিনা। মাকে আবারো জড়িয়ে বললাম “মা,তোমার আশীর্বাদ সফল হয়েছে”। মাও দেখি মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন।
এম এ পড়তে গেলাম। বাবার নিষেধ না মেনেই। তখন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ফাইন আর্টসের সব ক্লাশ হতো। আমার বিষয় রবীন্দ্র সংগীত। আমাদের তখন নিজস্ব কোনো ঘর ছিল না। প্রায় উদবাস্তুর মতো, রবীন্দ্রভারতীর যে-প্রান্তে অফিস ঘর ইত্যাদি ছিল, সেখানে যখন ঘর খালি থাকতো, সেখানে আমাদের গানের এবং পড়াশুনোর ক্লাশ হতো। আমাদের এবং, শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও সুবিধা-অসুবিধা বা অসহায়তা ছিল অসহনীয়। পড়াশুনোর ক্লাশটা করতে চেয়ার টেবিলের দরকার হতো। কিন্তু গানের ক্লাশ মেঝেতে শতরঞ্চি বা ফরাশ না পেতে করাটা একেবারেই অসম্ভব ছিল। কারণ, হারমনিয়ম, তবলা, তানপুরা ছাড়া কোনোমতেই গান শেখানোর কাজটা করা যায় না! এই যন্ত্রগুলি রাখার তো একটা জায়গার দরকার। এইরকম অবস্থায় বিভাগীয় প্রধান হিসেবে সুচিত্রাদির যন্ত্রণা ছিল লক্ষ্যণীয়।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দোতলায় উপাচার্যের ঘর, যাবতীয় অফিস ঘর, টিচারদের বসার ঘরসহ আমাদের পঠন-পাঠনের ঘরও ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, ঘর খালি থাকলে আমরা পড়াশুনো বা গান শেখার সুযোগ পেতাম। একমাত্র সুচিত্রাদিকেই দেখতাম এই অব্যবস্থার কারণে বিচলিত হতে। তিনি যখন দেখলেন রবীন্দ্র সংগীত বিভাগের তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্বেও কোনো ঘর পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই তিনি উপাচার্যের ঘরে যাবার পথ আগলে আমাদের বসিয়ে গান শেখাতেন। একটা চেয়ারে বসে, আর একটা টুলের ওপরে হারমনিয়ম রেখে তিনি গান শেখানো শুরু করলেন। একাধিক দিন এমনও হয়েছে, উপাচার্য দাঁড়িয়ে থেকেছেন, দিদির ক্লাশ না শেষ হওয়া পর্যন্ত। আমাদের খুব করুণ অবস্থা হতো। কিন্তু দিদি তাঁর কাজে অবিচল থাকতেন। অন্যান্য টিচারেরা অবশ্য ঘর খালি পেলে তবেই গান শেখাতেন বা পড়াতেন। একদিন উপাচার্য মহাশয় এসে আমাদের ইশারায় বললেন, একটু সরে সরে বসে তাঁকে তাঁর ঘরে যেতে দেওয়ার কথা। আমরা কি করি, দিদি তো তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দুচোখ বন্ধ করে গান গাইছেন। তিনি গান শেখাচ্ছেন, আমরা গাইছি। উপাচার্য কি আর করেন। সেই দাঁড়িয়েই রইলেন। পরে জানা গেছে ,যতদিন না তিনি আমাদের রবীন্দ্র সংগীত বিভাগের জন্য ঘরের ব্যবস্থা না করবেন, ততোদিন পর্যন্ত দিদি ঠিক করেছিলেন, সেই ভাবেই তাঁর ক্লাশ নেবেন। দিদির এমন কাজের সমালোচনা করার কোনো কারণ ছিল না। চিতপুরের দিক থেকে রবীন্দ্রভারতীতে ঢোকার যে পথ ছিল, সেই দিকটাতে বাংলা গান, নাটক, নাচ, পেইন্টিং বিভাগের একাধিক খুব খুব বড়ো বড়ো ঘর ছিল। কিন্তু সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ-এর দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার দোতলা বাড়ির সব ঘর গুলোতেই অফিস, উপাচার্যের ঘর, টিচারদের বসার ঘর ইত্যাদি ছিল।

অবশেষে আমাদের, মানে রবীন্দ্র সংগীত বিভাগ ঘর পেলো। আসল ঠাকুরবাড়ির সেই পুরনো আমলের খানিক ম্লান প্রায় সব ঘর নিয়েই রবীন্দ্র সংগীত বিভাগের আত্মপ্রকাশ ঘটলো। এই বাড়ি সম্পর্কেই রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠানের আগমনের পরে, তিনি (নতুন বৌঠান) বলেছিলেন “বাড়িটা ছিল বেদের বাসা”। কাদম্বরী দেবীর আগমনের পরে সেই বেদের বাসায় যুঁই, বেলিসহ নানান ফুলের বাগান হলো। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় বিহারীলালসহ একাধিক গুণীজন আসতেন, কবিতা, সাহিত্য পাঠ, গান গাওয়া হতো।

একদিন “বারোমাস” নামে একটি মাসিক পত্রিকা থেকে একজন সাংবাদিক এসেছিলেন, দিদির একটা ইন্টারভিউ নিতে। আমাদের তখন ক্লাশ চলছিল। তা শেষ হলে দিদি আমাকে আর সুমাল্যকে ডেকে পাঠালেন। দিদির ঘরে এলাম। তিনি বললেন “ইনি এসেছেন, তোমাদের বিভাগ সম্পর্কে খবরাখবর জানতে। তোমরা যদি এই বিষয়ে কিছু বলো তো ভালো হয়”। আমরা মূলত আমাদের বিভাগের জন্য জায়গা পাওয়া, দিদি কত লড়াই করে রবীন্দ্র সংগীত বিভাগের জন্য একটা আস্ত বাড়ি পেয়েছেন তার কথা, সেই বাড়ির জীর্ণ অবস্থার কথা ইত্যাদি নিয়ে কথা বললাম। দিদির প্রায় একক প্রচেষ্টায় আমরা যে আলাদা ঘরে গান শেখার সুযোগ পেয়েছি, সেটাই ছিল আমাদের কথার মূলসুর। কিন্তু সুমাল্যর নয়, আমার কথাই যে কি ভয়ানক সর্বনাশ আমার জন্য ডেকে আনবে তা সেদিন বুঝিনি। সেই পত্রিকায় যখন দিদি এবং আমাদের কথা প্রকাশিত হলো, তার কদিনের মধ্যেই আমাদের এম এ ফাইনাল পরীক্ষা হওয়ার কথা। ওই সময়ে “বারোমাস” পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের কথা পড়ে আমাদের শিক্ষক সুশীল চট্টোপাধ্যায় সুচিত্রাদিকে ফোন করে আমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেন। তাঁর এবং মায়াদির অত্যন্ত রাগ হয়েছিল এই কারণে যে “আমি কেন বিভাগীয় উন্নতির জন্য শুধুমাত্র সুচিত্রাদির কথা বলেছি”। দিদি সেই রাতেই আমাকে ফোন করে সমস্ত কথা জানালেন। তখন আমি যেহেতু মায়াদির কাছে গান শিখি, সেহেতু মায়াদির কথা পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে কেন বলিনি, এটাই মায়াদির আমার ওপরে রাগের কারণ। সুশীলবাবু দিদিকে বলেছেন মায়াদিও নাকি খুব খুব রাগ করে আমার সম্পর্কে নানা কথা সুশীলবাবুকে বলেছেন। সব শুনে তো আমি ভয়ে, দুঃখে একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছি। দিদিকে বললাম কি করব এখন? দিদি পরামর্শ দিয়ে বললেন “তোরা যা যা বলেছিস, সে সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে সব লিখে “বারোমাসের” সম্পাদকের কাছে একটা চিঠি দে। আর পরীক্ষার হলে একদম ভয় পাবি না”। সেই সময় দিশেহারা আমি চিঠি লেখার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছি! দিদি কিছু আভাস দিলেন। আমি সেই মতো একটা চিঠি পাঠালাম। পরীক্ষার ঠিক আগেই আমার চিঠি প্রকাশিত হলো। কিন্তু সেদিন আমি বুঝেছিলাম পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা, অসূয়া কি ভয়ানক! মায়াদির কাছে আমি এম এ পড়তে আসার অনেক আগে থেকেই গান শিখতাম। ওঁর স্নেহধন্য আমি আমৃত্যু একথা স্মরণে রাখবো যে, মায়াদির মতো অমন সুদক্ষ রবীন্দ্র সংগীতের শিক্ষিকা ওই সময়ে কেন, তারপরেও আর কেউ ছিলেন না। মায়াদির সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতার কথা অন্য পরিসরে হয়তো প্রকাশ পাবে। কিন্তু তাঁর ছাত্রী বলে সুচিত্রাদির বিভাগীয় কর্ম দক্ষতার কথা বলে আমি যে খুব অন্যায় করেছি, একথা সেদিন কেন, আজও মেনে নিতে পারিনি। একটাই কারণে, তা হলো সত্য কথা বলাটা কি অপরাধ?

আমাদের পরীক্ষা শুরু হলো। বেশ বুঝতে পারছিলাম, পরীক্ষার হলে আমি যেনো এক সচল অপরাধী। সুশীলবাবু তো গার্ড দেবার সময় বলেই বসলেন “আমরা কি ডিপার্টমেন্টের কেউ নই?” ভীত সন্ত্রস্ত আমি এক পরীক্ষার্থী নির্বাক! মায়াদি তো গার্ড দেবার সময় এমন ভাবে আমার দিকে তাকাতেন, আমায় গিলে খাবেন! যাই হোক লিখিত পরীক্ষা শেষ হলো। আমি তো বুঝেই গিয়েছিলাম কি হতে চলেছে। থিওরির পরীক্ষায় আমাকে কেউই রাগবশত কিচ্ছুটি করতে পারবেন না। আমি আঘাত পাবো প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষায়। থিওরির পরে কটা দিন সময় পেয়েছিলাম। সুচিত্রাদিকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম কোন কোন গান গাইবো, ইত্যাদি। দিদি বললেন “আমার শেখানো কোনো গান চয়েসড গান হিসেবে গাইবি না”। ফিফথ পেপারের পরীক্ষার দিন মায়াদি, সুমিত্রাদি (সুমিত্রা সেন) আর এক্সটারনাল পরীক্ষক হিসেবে গীতা সেন ছিলেন। সব্বাই বদ্যি। আর বদ্যিদের মধ্যে মিলমিশের কথা আবিশ্ব সুবিদিত। আমি তো সেদিন ধরেই নিয়েছিলাম কি হতে চলেছে। গীতাদি একটি গানের সঞ্চারী অংশটুকু প্রথমেই গাইতে বললেন। কঠিন তালের সেই গানটি হুট করে সঞ্চারীটা গাওয়া খুব খুব কঠিন কাজ ছিল। আমি গাইলাম। প্রায় মন শক্ত করেই। মায়াদি বললেন “যা ইচ্ছে, তাই গাও”। আমি মায়াদির বাসার ক্লাশে শেখা আমাদের সিলেবাসের একটা গান গাইলাম। একদম নিখুঁত। বিনীতভাবে বোঝাতে চাইলাম আরো গানের কথা তাঁরা বলুন। সুমিত্রাদি আর কিছু বললেন না। সিক্সথ পেপারের পরীক্ষায় সুশীলবাবু চয়েসড গান গাইবার আগেই বলে বসলেন “তিন রকম তালের তিনটি গানের প্রথম দুই লাইন করে গাও”। সেই বারেও আমি হার না মানা ছাত্রী। সেভেন্থ পেপারে যেখানে ঊীঢ়বৎরসবহঃধষ াধৎরধঃরড়হ : ঘবি ঞুঢ়ব শিরোনামে পনেরোটি গান ছিল এবং ওই পেপারের গানগুলি প্রায় সকলেই একটা-দুটো করে শিখিয়েছেন। মাত্র দুটি গান “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” এবং “মরণরে তুঁহু মম”- শিখিয়েছিলেন সুচিত্রাদি। দিদি বলেছিলেন তাঁর শেখানো কোনো গান চয়েসড গান হিসেবে না গাইতে। কিন্তু আমি সেদিন দিদির অবাধ্য হয়েই “কৃষ্ণকলি” গানটা গাইলাম। ওই দিন সুচিত্রাদি ছাড়াও এক্সটারনাল পরীক্ষক ছিলেন সুভাষ চৌধুরীর স্ত্রী সুপুরণাদি। আর লক্ষনউ থেকে একজন এসেছিলেন। তিনিই বললেন “গাও”। গাইলাম। আমার সমস্ত প্রানবায়ু নিঃশেষ করে, প্রাণ ঢেলে। ভেবেছিলাম অতো বড়ো গান, সবটা হয়তো শুনবেন না। কিন্তু পুরো গানটা গাইলাম। দেখি দিদি মাথা নীচু করে কাঁদছেন। কান্না দিদির অলঙ্কার ছিল। ব্যস, ধরেই নিলাম, ভালো গেয়েছি।

শেষ হলো আমার, রবীন্দ্র সংগীতে এম এ পড়াশুনো এবং সাহসের পরীক্ষার পর্ব। ফার্স্ট ক্লাশ পেয়েছিলাম, সেটা আর আটকানো যায় নি। কিন্তু রেজাল্টের জন্য ভয় ছিল এবং তা নিছক মিথ্যে নয়। থিওরির থেকে প্র্যাক্টিকালে অনেক ভালো করা সত্বেও কম নম্বর পেয়েছিলাম। বালিগঞ্জ প্লেসে মায়াদি থাকতেন। আমার এম এ পরীক্ষার অনেক বছর আগে থেকেই আমি মায়াদির কাছে গান শিখতাম। সত্যি বলতে কি, আমি না মায়াদির খুব খুব কাছের এবং একজন খুব প্রিয় ছাত্রী ছিলাম। কিন্তু একেবারেই বিনা কারণে মায়াদির সাথে সেই নিবিড়, অনাবিল সম্পর্কে চিঁড় ধরেছিল।

সুচিত্রাদি তখন থাকতেন সুইনহো স্ট্রীটে একটা বাড়ির দোতলায়। এক তলায় থাকতেন সুবিনয় রায়। মায়াদির কাছে যাওয়াটা আর হলো না। বন্ধ হয়ে দেলো! বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমার গান শেখার দফা রফা হলো! সুচিত্রাদির বাড়িতে যাতায়াত শুরু করলাম। কিন্তু ওই মাঝে সাঝে। বালিগঞ্জ প্লেস আর সুইনহো স্ট্রীট, এক্কেবারে গা লাগোয়া দুটি জায়গা। ইতিমিধ্যে সুচিত্রাদি বাসা বদল করে চলে এলেন, গড়িয়াহাট ট্রাম ডিপো সংলগ্ন দিদির কথায় “আকাশছোঁয়া” স্বস্তিক অ্যাপার্টমেন্টের দশ তলায়। ছাদ ভর্তি দিদির পছন্দের গাছ। আমৃত্যু দিদি এই বাড়িতেই ছিলেন।

আমাদের সিক্সথ পেপারের গানগুলি ছিল ক্লাসিক ধরনের । মায়াদি আর সুচিত্রাদি ভাগাভাগি করে এই গানগুলি শেখাতেন। মায়াদির কাছে যাওয়া বন্ধ হলে পর, এই গানগুলি খানিক ঝালিয়ে নেবার জন্য মাঝে মধ্যে সুচিত্রাদির বাড়িতে যেতাম। একদিন তিনখানি গান, ‘ কি ভয় অভয়ধামে’, ‘তোমারি মধুর রুপে’ আর ‘আমারে করো জীবনদান’-গাইবার জন্য দিদির বাসায় যাবো বলে দিদিকে জানালাম। এও বললাম যে দিদি থিয়োরি পেপারের “ছন্দের” যে অংশটা পড়াতেন, সেই অংশের খানিকটা ঠিক করে নেওয়া দরকার। দিদি বললেন “চলে আয়”। একদিন বেলা দশটা নাগাদ গেছি, দরজা খুলতেই আমি তো অবাক! প্রাচ্য পাশ্চাত্যের রূপ মেলানো দিদির পরনে লাল টুকটুকে একটা হাউজকোট। কী অসম্ভব সুন্দর, ফুটফুটে ছেলেমানুষের মতো দেখতে লাগছিল! বসার ঘরে গিয়ে বসলাম। দিদি এলেন, দেখি দিদির ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলে রক্ত। ছুরি দিয়ে শাক কাটতে গিয়ে কেটে গেছে। আমি লিউকোপ্লাস্টার লাগিয়ে দিলাম। বললান, বাকি সব্জি আমি কেটে দিই। দিদি বললেন, ”দ্যাখ,তুই গান তিনটের শক্ত মনে হওয়া জায়গা গুলো গা। আমি কাজ করতে করতে শুনি, ভুল থাকলে তা শুধরে দেবো”। এইখানেই শেষ নয়, দিদি তাঁর লেখা লম্বা একটা নোটের খাতা বার করে আনলেন। আমি আর গান গাইতে পারলাম না। দিদির আঘাতের কথায় মনটা খারাপ হয়ে গেলো। শুধু খানিকটা নোট টুকে আনলাম। দিদি তখন বলতে লাগলেন “জানিস দুঃখ কষ্টের মধ্যেই সুখ-আনন্দ লুকিয়ে থাকে”। সেদিন সেই কথার অর্থ বুঝিনি। আজ বুঝি, এ যে দিদির, আমার আমাদের অনেকের জীবন দেবতার বিশ্বাস, চিন্তা, চেতনার কথা! দিদি আরও বলতে লাগলেন “জানিস, আমি না অনেক বেশী বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ পাশ করেছি। ফাইনাল পরীক্ষার সময় দুটো পেপারের পরীক্ষা হয়ে গেছে। থার্ড পেপারের পরীক্ষার আগের দিন রাতে ছেলের ধূম জ্বর। সারারত ধরে একবার পড়ছি আর একবার করে ছেলের গায়ে হাত দিয়ে দেখে আসছি, জ্বর কেমন তা বোঝার জন্য। এইভাবে আমার এম এ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল”।

আরেকদিনের কথা। দিদির বাসায় গেছি, আমার একটা ব্যক্তিগত কারনে। সব শুনে তিনি বললেন “তুই তো আমার পাড়ার মেয়ে”। মানে? আমি বলছি এককথা, আর দিদির কথায় একেবারেই অন্য সুর! এ কী? হঠাত করে আমি বুঝতে পারিনি পাড়ার মেয়ে বলতে দিদি কি বোঝাতে চাইছেন। তারপর তিনি আবারো বলতে লাগলেন “তুই না ইছাপুরে জন্মেছিস, বড়ো হয়েছিস”। আমি বললাম হ্যাঁ। দিদি বললেন, ”আমিও তো ইছাপুরে মাঝেরপাড়ার মেয়ে, আমাদের ছোটবেলা ওখানেই কেটেছে। আচ্ছা তোর ডাক নাম কি রে? জানিস আমার জন্ম না বিহারের গজান্ডি স্টেশনে, ট্রেনের কামরায় হয়েছিল। তাইয়ামার ডাক নাম গজু”। আমি চুপ করে শুনছিলাম। কারণ আমার মনে তো তখন অন্য কথার আনাগোনা। মানে আমি যেকথা ওনাকে বলতে গিয়েছিলাম, মনে মনে সেই কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। দিদি ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বললেন “তোকে একটা কথা বলি? তুই না রোজ রাতে শোবার আগে একটা করে গুরুদেবের গানা গেয়ে শুবি, আর তা না পারলে, একটা গান অন্তত পড়ে ঘুমিয়ে পড়বি”। বললাম আচ্ছা দিদি।

এম এ পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবার আগেই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আমি আর মা গিয়েছিলাম দিদিকে নিমন্ত্রণ করতে। দিদি মা কে বলেছিলেন “মেয়েটার তো রেজাল্টও প্রকাশ হল না। অল্প বয়স, এতো তাড়াতাড়ি ওকে বিয়ে দিচ্ছেন”। আসলে আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে খুব চাপ আসছিল। মা এই কথা দিদিকে বললেন। দিদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মায়ের ওই কথা তাঁর একটুও পছন্দ হয় নি।
রবীন্দ্রভারতীতে যখন পড়তাম, তখন দিদি তাঁর সহকর্মী, একান্ত বন্ধু, আমাদের থিওরির শিক্ষক ধ্রুব মিত্রকে দিদির গাড়িতে করে একসাথে ফিরতেন। সেই সময় চিত্তরঞ্জন অ্যাভেন্যুতে মেট্রো রেলের কাজ চলছিল পুরোদমে। রাস্তার তখন যে কি অবস্থা, তা বলার বা চলার, সবটাই কহতব্য নয়। জোড়াসাঁকো অঞ্চলে বর্ষায় জল জমার কথা সব্বার জানা। একদিন লাইব্রেরীর কাজ সেরে, প্রায় হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তুলে, কাঁধে কাপড়ের ঝোলা ব্যাগে বইপত্তর নিয়ে শেয়ালদহের দিকে বাসায় ফেরার জন্য আসছি। খানিক হেঁটে আসার পর দেখি আমার পাশেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো, দিদি বললেন “এতো জল, তুই চলে আয় আমার গাড়িতে”। আমি তো অবাক! না বলার স্পর্ধা আমার ছিল না। তবুও বললাম, আমি তো যেদিকে যাবো, সেদিকে আপনার আসা যাওয়ার পথ নয়। তাই থাক, বৃষ্টি হলে তো কষ্ট করেই চলতে হয়। দিদি বুঝলেন, বললেন “সঙ্গে টাকা আছে? তেমন অসুবিধা হলে একটা ট্যাক্সি নিস”। বললাম, না না ঠিক চলে যাবো।

আমাদের ক্লাষ শেষ হলে দিদির বসার ঘরের উপর দিয়েই আমাদের আসতে হতো। মানে, ওইখান দিয়েই ক্লাশে আমাদের আসা যাওয়ার পথ ছিল। একদিন ফেরার পথে উঁকি দিয়েছি, দিদির চোখে চোখ পড়ে গেলো। দিদি বললেন “আয়”। ঘরে ঢুকতেই দিদি সহাস্যে বললেন “আজকের তারিখটা কিন্তু খুব মজার, সে কি জানিস”। বললাম না তো। দিদি বললেন “তোর কাছে কোনো বই আছে”। আশ্চর্য, ওই দিন আমার ব্যাগে রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম খন্ডটি ছিলো। মানে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেবার রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশ করেছিল। আমরা তার সাবস্ক্রাইবার হয়েছিলাম। ইউনিভারসিটিতে আসার পথে প্রথম খন্ড প্রেস থেকে নিয়ে এসেছিলাম। দিদিকে সেই কপিটা দিলাম। দিদি তাতে লিখে দিলেন “গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে”-আর তার তলায় “স্নেহাশীর্বাদসহ – সুচিত্রা মিত্র, ১৮। ১১।১৮”। পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন তারিখটা একদম অন্য রকম, মানে আর কোনো দিনও আসবে না!।

এম এ পড়ার সময় দুটি বছর দিদি অন্য গানের সঙ্গে নাগাড়ে ওনার পেপারের দুটি গান “কৃষ্ণকলি”,এবং “মরণরে তুঁহু মম”-শিখিয়েছিলেন। যতটা সম্ভব পারফেকশন করে যাতে আমরা গাইতে পারি তার জন্য। কৃষ্ণকলি গানটি শেখাবার সময় বার বার বলতেন ঞৎু ঃড় ঢ়ঁঃ ুড়ঁৎংবষভ রহ যবৎ ঢ়ড়ংরঃরড়হ “,এই “হার” মনে “কালো মেয়ে”। বলতেন “তোদের মনটাকে শান্তিনিকেতনে ভুবনডাঙ্গার মাঠে নিয়ে যা”। গানটির প্রতিটি “কালো”একদম আলাদা আলদা ভাবের প্রকাশ নিয়ে গাওয়া, এ যে কি কঠিন, তা আজও বুঝি।

দিদি যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সেই একই জায়গায় কবি অরুণ মিত্রও থাকতেন। আমি অরুণবাবুর কাছে মাঝে মাঝে যেতাম। একদিন অরুণবাবুর বাড়ি থেকে দিদিকে দেখতে গেছি। দিদির আমৃত্যু, একমাত্র সঙ্গী বাবলুদা দরজা খুললেন। বললাম দিদিকে একবার দেখে যাই, অরুণবাবুর কাছে এসেছিলাম। ভাবলাম দিদিকে একবার প্রণাম করে যাই। বাবলুদা বললেন “না, আজ আর হবে না”। বলে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি লিফটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। বাবলুদা এসে বললেন আপনার নাম? বললাম। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ছুট্টে এসে বাবলুদা বললেন, দিদি আপনাকে ডাকছেন। দিদিকে সেদিন খুব মনমরা অবস্থায় দেখলাম। ভালো লাগলো না। দিদি খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করে বললেন “ভালো আছিস”? দেখি দিদির দু’চোখ জলে ভরা। আমারো গলা ধরে এলো। অস্ফুটে বললাম আছি। সেই দিদির সাথে শেষ দেখা।

“কৃষ্ণকলি” এবং “মরণরে”-এই দুটি গান দিদি আমাদের খানিকটা অন্য ভাবে শিখিয়েছিলেন। অর্থাৎ ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর কাছে যেভাবে তিনি গানটি শিখেছিলেন, ঠিক সেইভাবেই দিদি আমাদের গান দুটি শিখিয়েছিলেন। সেইভাবে শেখা গান দুটি, চারটি কার্বন কপি করে আমাদের দিয়েছিলেন। আমরা আবার তা জেরক্স করে দিদিকে ফেরত দিয়েছিলাম। একদিন আমাদের নাচের টিচার সুমিতদা আমাকে বললেন, দিদি তোমাকে একবার ডেকেছেন”। আমি না তা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। ছুটির পরে যখন আমার মনে পড়লো, তখন প্রায় আমি ছুটতে ছুটতে দিদির কাছে গেলাম। দিদি বললেন “দাঁড়া এক মিনিট”। দেখলাম ব্যাগ থেকে গান দ’ুটির একটি করে কপিতে “শ্রীমতি ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর কাছে এই গান দুটি যেভাবে শিখেছিলাম, ঠিক সেই ভাবেই স্বরলিপি করে কল্যাণীয়া মিতাকে দিলাম, আশীর্বাদিকা সুচিত্রা মিত্র”।

জন্মলগ্ন থেকেই দিদি অতুলনীয়া! রূপ, গুণ, রবীন্দ্রনাথের গান কন্ঠে ধারণ ও লালন করার ক্ষেত্রে অসামান্যা, অনন্যা, রবীন্দ্র সংগীতের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বা চর্চা-ইত্যাদি সবকিছুর প্রেক্ষিতে সুচিত্রা মিত্র একজন অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। আসলে ওনার সম্পর্কে কিছু বলতে যাওয়াটা এই অধমের কর্ম নয়, বরং ধৃষ্টতা। তবুও না বলার ইচ্ছার কাছে বার বার নতজানু না হয়ে পারি না। আসলে স্মৃতি কেমন যেনো তাড়িয়ে বেড়ায়। আর সেপ্টেম্বর মাসে আরও বেশি করে দিদির কথা মনে পড়ে। এই মাসের উনিশ তারিখেই তো এই ধরাকে আলোকিত করে দিদি জন্ম গ্রহণ করেন।

“মৃত্যু” কথাটি অভিধানে থাকলেও, সব মরণ সমান নয়। আবিশ্ব এমন বহু মহামানব, মহামানবী আছেন, যাঁদের ক্ষেত্রে “মৃত্যু” কথাটি এমনভাবে প্রযোজ্য নয় যে তাঁরা চলে গেছেন। তাঁদের পর্ব শেষ। তাঁরা আর পাঁচজনের লোকান্তরিত হওয়া থেকে সর্বার্থেই আমাদের মধ্যে না থেকেও, আলাদা এক মহিমায় মানবসমাজে উদ্ভাসিত। সুচিত্রা মিত্রও তেমনই একটি নাম। আমার স্মৃতিতে চেতনায়, বিশ্বাসে তিনি আমার মতো আরও বহু বহু জনের মধ্যে চিরভাস্বর। আসলে “ শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here