রায়ের প্রতিক্রিয়ায় কে কি বললেন একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা

0
10

ঢাকা: আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া মামলার অন্য ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে একুশে আগস্টের ওই ঘটনায় দায়েরকৃত পৃথক মামলায় একই সঙ্গে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে রায় ঘোষণার জন্য আজ বুধবার তারিখ ধার্য করে আদেশ দেয় আদালত। সে অনুযায়ী আজ জনাকীর্ণ আদালতে রায় ঘোষণা করা হয়।

ওবায়দুল কাদের : রায় ঘোষণার পর দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এই রায়ে অখুশি নই। কিন্তু পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। কারণ এই রায়ে প্ল্যানার এবং মাস্টারমাইন্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি দরকার ছিল, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট।’

পরে বিকালে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা তারেক রহমানের ফাঁসি দাবি করছি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফাঁসি দাবি করছি। যে বর্বর তাণ্ডব করেছে ওই দিন, মুফতি হান্নানের জবানবন্দিতে তা এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে আপিলের আবেদন জানাব।’

আনিসুল হক : সকালে রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘রায়ের কাগজপত্র পাওয়ার পরে আমরা চিন্তা-ভাবনা করব যে এই রায়ে তারেক রহমানকে এবং আরও দুজন- কায়কোবাদ এবং হারিছ চৌধুরীকে যে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে সেটার জন্য আমরা উচ্চতর আদালতে গিয়ে তাদের ফাঁসির জন্য আমরা… এনহান্সমেন্ট বলে সেটা আইনে… এনহান্সমেন্টের জন্য আমরা আপিল করব কি না।’

মির্জা ফখরুল : নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি মনে করে, এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার নগ্ন প্রকাশ। আমরা এই ফরমায়েশি রায় প্রত্যাখ্যান করছি।’

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘আমরা সরকারের এহেন প্রতিহিংসামূলক আচরণ ও আদালতের মাধ্যমে তা কার্কর করার নোংরা কৌশল। সজাগ হয়ে অনির্বাচিত এই সরকারকে হটিয়ে জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

মওদুদ আহমেদ : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এই মামলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণ, উপাত্ত-তথ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয় নাই। তা সত্ত্বেও তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য।’

মাহবুবে আলম : সুপ্রিম কোর্টে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জজ মিয়া নামের এক নিরপরাধ লোককে আসামি সাজানো হয়েছিল, সে পর্যায় থেকে মামলাটি আলোর মুখ দেখেছে এবং অপরাধীরা সাজা পেয়েছে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি বড় সার্থকতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসে আজকে একটি মাইলফলক সূচিত হলো। এই মামলাটিকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য নানারকম ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। জজ মিয়া নামের এক নিরপরাধ লোককে সাজানো হয়েছিল আসামি, সে পর্যায় থেকে মামলাটি আলোর মুখ দেখেছে এবং অপরাধীরা সাজা পেয়েছে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি বড় সার্থকতা।’

সৈয়দ রেজাউর রহমান : রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার প্রধান কৌঁসুলী সৈয়দ রেজাউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘এ রায়ের মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। ১৬ কোটি মানুষ যে রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন, আজ সে রায় হয়েছে।’

জয়নুল আবেদীন : সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমরা আশা করি তারেক রহমান এবং যাদেরকে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তাদের সব আসামিকে খালাস করাতে সক্ষম হব।’

এম আমীর-উল ইসলাম : সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের অন্যতম নেতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করি যে এটা একটা খুব ভালো কাজ হয়েছে যে, তারেক রহমানকে শুধু যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। এখন তাকে নিয়ে এসে সাজা খাটানোর জন্য পথটি অন্তত খুলে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই রায়ে সুযোগ রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন দিয়ে। কারণ তারেক রহমানের তো ফাঁসি হওয়ারই কথা। যাবজ্জীবন দেওয়াটা ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি।’

ছাত্রলীগ : রায় শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ‘যে রায় দেয়া হয়েছে, তাতে আমরা কেউই সন্তুষ্ট নই। ছাত্রসমাজ এ রায়ে সন্তুষ্ট না। আমরা চাই তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে এনে ফাঁসি দেয়া হোক। এ দাবিতে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেব। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’

ছাত্রদল : এদিকে রায় প্রত্যাখ্যান করে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মিছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল শাখার নেতারা অংশ নেন। মিছিলে ছাত্রদল নেতারা তারেক রহমানের সাজা বাতিল এবং তাকে এ মামলা থেকে আব্যাহতি প্রদানের দাবিতে স্লোগান দেন।

রায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ১৮ আসামি হলেন : সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎজ্জামান বাবর, বিএনপি-জামায়াত জোটের সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজির সাবেক আমির মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আব্দুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল, মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, মো. উজ্জল, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক হানিফ।

পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি প্র্যত্যককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আদালত।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন : তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হুজি সদস্য হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম মাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম আরিফ, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু। তাদেরকে দন্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দেয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ডিএমপির সাবেক উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, আরেক সাবেক উপ-কমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক বিশেষ সুপার মো. রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আরেকটি ধারায় খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমিন, আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

১৪টি বিবেচ্য বিষয় নির্ধারণ করে তা পর্যালোচনা, সাক্ষ্য-তথ্য প্রমাণের আলোকে এ মামলার রায় ও আদেশ দেয়া হয়েছে বলে আদালতের রায়ে বলা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here