বিজয়ের আলোয় আলোয় সুখ-দুঃখের গল্প

0
117

আহমেদ মূসা
একাত্তরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার শাহবাগ ও পরিবাগের মাঝামাঝি যে মহল্লায় বাস করতাম, সেখানে আমরা বাঙালী মুসলমানরা ছিলাম দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। প্রথম শ্রেণীর নাগরিক ছিল মহল্লার পাঞ্জাবী ও উর্দুভাষী মোহাজেররা। মহল্লার হিন্দুরা ছিল তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। আমাদের প্রতি অবাঙালীদের অবজ্ঞা, বিদ্রুপ ও অত্যাচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। তাই বাংলাদেশের

আহমেদ মূসা

স্বাধীনতা দ্রুত অর্জনের আকাক্সক্ষা আমাদের মধ্যে ছিল সমধিক। দেশ আমাদের, অথচ বাস করছি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতোÑএ যন্ত্রণা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না।
আত্মজৈবনিক এই খন্ড-স্মৃতিচারণটি বেশ কয়েক বছর ধরে লিখছি । প্রতিবারই কিছু না কিছু যোগ করি। অনেক কথা মনে পড়ে, ভাবি পরে লিখবো। লেখার সময় বেশি আবেগ-প্রবণ হয়ে উঠলে ক্ষান্ত দিই। অপেক্ষা করি আবেগ থিতিয়ে আসার। কিন্তু এই আবেগ আর থিতু হয় না। হয়তো বা হবেও না। এই আবেগ বড় তীব্র ও পবিত্র। সেই বাল্যকাল থেকে আমি পাকিস্তানের নিপীড়কগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দালাল-তাঁবেদারদের নিকট থেকে দেখে আসছি। সে কারণেও আমার ঘৃণা ও বেদনা তীব্রতর।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর এ পর্যন্ত চার হাজারেরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তালিকা-সম্বলিত একটি গ্রন্থই প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তাদের সাধুবাদ এই প্রয়োজনীয় কাজটি করার জন্য। তালিকায় আমার নিজের সম্পাদিত ‘জনগণের মুক্তিযুদ্ধ, চেতনার স্বরূপ-সন্ধান’-এর পাশপাশি আছে আমার অনুলিখন করা বিখ্যাত ব্যক্তিদের বইওÑসাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার কাজী নূর উজ্জামানের ‘মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতি’। তালিকায় আমার অনুলিখন করা আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ আবদুল মান্নান ভুঁইয়ার ‘জীবন ও সংগ্রাম’ থাকা উচিত। কারণ, এই গ্রন্থেরও বড় অংশ জুড়ে আছে নরসিংদী-শিবপুর অঞ্চলে মান্নান ভুঁইয়ার নেতৃত্বে বীরত্বপূর্ণ মুক্তি সংগ্রামের কথা। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
তালিকায় প্রধান ভাবে উপস্থিত আছে মুক্তিযুদ্ধের ওপর এ-যাবতকালের সবচেয়ে সাড়া জাগানো ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ আকর গ্রন্থের কথা, যার তথ্য-সংগ্রাহকদের একজন আমি এবং গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র যখন প্রকাশ করে আমি তখন ঐ সংগঠনের প্রকাশনা সম্পাদক। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় ( প্রথম সংস্করণে সম্পাদকসহ কারো নামই ছিল না) ক্ষুদ্রকারে আমার ভূমিকার কথা স্বীকার করা হলেও এটা আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের কাজ। এমন বড় কাজের সুযোগ এক জীবনে বার বার আসে না।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রকাশিত চার হাজার বইয়ের প্রতি নতুন প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, এসব গ্রন্থ কালবিলম্ব না করে পড়তে শুরু করা উচিত। কারণ কাউকে যদি এর শতকরা দশটি বই পড়তে হয় তা হলে তাকে চার শ’ বই পড়তে হবে; শতকরা একটি পড়লেও তাকে পড়তে হবে চল্লিশটি বই। এ ছাড়া নিয়মিত ভাবে আরো বইতো প্রকাশ হয়ে চলেছেই। এ চলার বিরাম নেই। প্রকাশিত সব গ্রন্থই যে মান-সম্মত হবে তা-ও নয়। প্রয়োজনে বাছাই করার কাজটি করতে হবে তাদের নিজেদেরই।
তালিকায় বাংলাদেশের জন্মশত্রুদের লেখা কয়েকটি বইও আছে। ওদের বিশ্বাসঘাতকতার স্বরূপ বুঝতে সে-গুলিও পড়া উচিত। উদ্ধত এই জন্মশত্রুরা তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও পাপের জন্য জাতির কাছে আজও ক্ষমা চায়নি। বরং তাদের পাপ-অপরাধকেই হালাল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অঢেল অর্থ নিয়ে তারা সারা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে তাদের পক্ষে লবিং করার জন্য। অথচ, আপন দেশের মানুষের কাছে আপন কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে তাদের বড় লজ্জা। দেশের মানুষ তাদের ক্ষমা করলো কি করলো না, সেটা পরের কথা, কিন্তু ক্ষমা তাদের নিঃশর্ত ভাবেই চাওয়া উচিত। তা না করে এই বিশ্বাসঘাতকরা শুধু দেশের মানুষের সামনে কেন, নিজের সন্তানদের কাছে কি করে মুখ দেখায় সেটা আমি আজও ভেবে পাই না। ধর্ম ব্যবসায়ীদের চাতুরিতে বিভ্রান্ত হয়ে কেউ কেউ আবার এদের অনুসরণও করে। সে আরেক দুর্ভাগ্য।
১৯৬৬ সালে আমি ঢাকায় পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হই হাতিরপুলের র‌্যাংকিন স্ট্রিটের ধানমন্ডি প্রাইমারী স্কুলে, পরে সিক্সে ভর্তি হই ধানমন্ডি হাইস্কুলে। হেমায়েতউল্লাহ আওরঙ্গ ছিল আমার ক্লাসমেট। এর আগে পড়তাম আমার গ্রাম ইজারকান্দী প্রাইমারী স্কুলে। স্কুলটি ঝড়ে উড়িয়ে নেওয়ার পর অনেকদিন ক্লাশ হয়নি। বাধ্য হয়ে বাবা ও বড় ভাই আমাকে ঢাকা নিয়ে যান।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর আমাদের ভূখন্ডের মানুষ ক্রমশ তিক্ত হতে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের পর অরক্ষিত তৎকালীন পূর্ব বাংলা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের আসল স্বরূপ। তাদের শোষণ-বঞ্চনার স্বরূপ প্রকাশিত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলি সে স্বরূপ তুলে ধরতে থাকে।
১৯৬৬ সালে ছয় দফা দিয়ে আওয়ামী লীগ অন্যদের পিছনে ফেলে এগিয়ে যায়। মন জয় করে বাঙালীদের। দুই ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টিগুলি স্বাধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিল ঐক্যবদ্ধ, যদিও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বহুধাবিভক্ত কমিউনিস্টদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বাঙালি জনতার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণে ব্যর্থ হয়। তবে ওরা ছিল বিচ্ছিন্ন ও খুবই তাৎপর্যহীন।
১৯৬৯ সালে নবম শ্রেণীতে ওঠার পর শুরু হয় গণঅভ্যুত্থান। এর আগে থেকেই যে দল পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং করতো, সুযোগ পেলেই ছুটে যেতাম। ঊনসত্তরে গণ-আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ পুস্তক বিরোধী আন্দোলন। এই গ্রন্থটি ছিল আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক বিকৃত পরিবেশনা। সক্রিয়ভাবে আমার কোনো আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সুযোগ আসে এরই মাধ্যমে। তখন ছাত্রলীগের শাখা হাইস্কুল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আমি ধানমন্ডি হাইস্কুল শাখার ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলাম। আমাদের অভিষেকে এসেছিলেন শেখ শহীদ। তখন বাসে ও সিনেমায় ছাত্রদের হাফ টিকিটের আন্দোলনও ছিল জোরদার। পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি পুস্তকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমাদের স্কুল ও পাশের মেহেরুন্নেসা গার্লস স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল নিয়ে চলে যেতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায়। সেখানে জড়ো হতো অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ডাকসু নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করতেন। বিশেষ করে তখন নূরে আলম সিদ্দিকী ও আসম রবের বক্তৃতা খুব উদ্দীপ্ত করতো আমাদের। প্রায়ই আমরা মিছিল নিয়ে যেতাম ডিপিআই ভবন ঘেরাও করতে।
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ হয়ে পড়লো মিটিং মিছিলের দেশ। এসবে অংশগ্রহণে আমার বাড়াবাড়ি দেখে পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন থাকতেনÑবিশেষ করে অবাঙালি-অধ্যুষিত মহল্লায় বাস করি বলে।
আমাদের স্টেশনারী দোকানটি ছিল হোটেল গ্রীন-এর সামনে। তৎকালের অন্যতম অভিজাত হোটেল এটি। মালিক উর্দুভাষী। তিনি ও তার হোটেলের অপারেটর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পাকিস্তান সরকারের পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন। তাই মিছিল দেখলেই গেট বন্ধ করে দেওয়া হতো ভয়ে। আমাদের দোকানের সামনে ছিল নবাব হাসান আসকারীর বাড়ি। মওলানা ভাসানীর জনসভা শেষে একদল মিছিলকারী এসে এই বাড়িতে যখন আগুন দেন, আমি তখন দোকানে। বাড়িটি পুড়িয়ে তারা আবার চলে যান পাশে খাজা শাহাবুদ্দিনের বাড়ি পোড়াতে। ( পরবর্তীকালে জেনেছি সেই জ্বালাও-পোড়াও মিছিলের অন্যতম নেতা ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা)। সন্ধ্যার পর কার্ফ্যু হলো। স্কুল বন্ধের সময় আমি দোকানে থাকতেই পছন্দ করতাম। সেদিনও দোকানের একটা ছোট দরজা খুলে রেখে ডিটেক্টিভ সিরিজ ‘কুয়াশা’ পড়ছিলাম। হঠাৎ দেখি দরজার সামনে চারজন দীর্ঘদেহী সৈন্য। এই গলির ভেতর আর্মি আসবে আমার কল্পনায়ও ছিল না। পড়ায় নিমগ্ন ছিলাম বলে বুটের আওয়াজ লক্ষ্য করিনি। ওদের দেখে পাংশু মুখে তাকিয়ে রইলাম। একজন কর্কশ কন্ঠে বললো, ‘শালে, দোকান খুলকে রাখ্খ্যা, তুমকো পাতা নেহি আভি কারফু চলরাহা?’ আমি ঢোক গিলে চোস্ত উর্দুতে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমি সবসময় দোকানেই থাকি। গরম লাগছিল বলে একটা পার্ট খুলে রাখছি। এ জন্য আমি খুবই শরমিন্দা। আমার মুখে অরিজিনাল একসেন্টের উর্দু শুনে হয়তো একটু সদয় হয়েছিল। অন্য একজন আমার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বললো, ‘ছোড়ো ইয়ার, বাচ্ছে হ্যায় না?’ প্রথমজন বললো, ‘উসকো গোলী মার দে না চাহিয়ে।’ আমি নিরত্তর। দোয়া-দুরুদ পড়ছি মনে মনে। এরপর প্রথম সেনাটি যে কাজ করলো তাতে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচলেও মনে বড় কষ্ট পেলাম। সে দোকানের ঢালায় সাজানো সিগারেট থেকে দুই প্যাকেট থ্রি-ক্যাসেলস ও দুই প্যাকেট প্লেয়ার্স নাম্বার থ্রি সিগারেট হাত বাড়িয়ে নিয়ে পকেটে ভরলো। তখনকার সময়ে এগুলি ছিল সবচেয়ে দামী সিগারেট। তারপর হাসতে হাসতে চারজনই চলে গেল। আমি দরজা বন্ধ করে কাঁপতে থাকলাম। পরে মহল্লার অবাঙালিদের বিশ্বাস করাতে পারিনি, যে সৈন্যরা এ কাজ করেছে। তাদের ধারণা, পাকিস্তানের সৈন্যরা এ কাজ করতেই পারে না। তারা ‘ইসলামের খেদমতগার।’ ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেওয়ার ভয়ে এ নিয়ে আর কথা বলি নি। অবশ্য ওদের এরকম দুর্বৃত্তপনায় খুব একটা বিস্মিত হইনি। মহল্লায় কয়েক শ অবাঙালি ছিল। তাদের কয়েকজনকে জুমাতুল বিদা আর ঈদের দিন ছাড়া নামাজ পড়তে দেখিনি। রোজাও নয়। অনেকেই নিয়মিত মদপান করতো।
আন্দোলেনের জোয়ার বাড়তে থাকলে মহল্লার পাঞ্জাবী ও বিহারীরা আমাদের সঙ্গে এই মর্মে সমঝোতায় এলো, কার্ফ্যুর সময় তারা আমাদের নিরাপত্তা দেখবে আর মিছিলের সময় আমরা তাদের নিরাপত্তা দেখব। কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙা যাতে না হয়।
এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন কাশেম ভাই। ভালো সংগঠক ও বক্তা। আমাদের পাশের দোকান তার, মটর পার্সের। আমাকে অত্যধিক ¯েœহ করতেন। তার দোকান থেকেই এনে পড়তাম ইত্তেফাক। আমার বড় ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ তখন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের একজন। সত্তরের নির্বাচনে তিনি ছিলেন নৌকা মার্কার এজেন্ট। তিনি তখন সাকুরা হোটেলের ম্যানেজার। অবশ্য ২৫ মার্চের কিছুদিনে আগে তাকে বদলী করা হয় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের রিফ্রেসমেন্ট রুমে। এগুলি একই মালিকের ছিল। থাকতেন অবশ্য আমাদের মহল্লাতেই।
মনে পড়ে, ১৯৭০ সালে আমি যখন ভোটারও হইনি, নৌকায় ভোট দিয়েছিলাম তিনটি। সারা দেশটাই তখন নৌকাময়। আমার মতো অতি উৎসাহীদের কর্মকান্ড ছাড়াই নৌকার বিজয় একই রকম হতো সন্দেহ নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
ইয়াহিয়া খান যখন ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন, বাঙালীরাও হয়ে উঠলো মারমুখী। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতি তখন ঐক্যবদ্ধ। মওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফ্ফর, মনিসিং প্রমুখও স্বাধীনতার মৌলিক প্রশ্নে একমত। ব্যক্তি নেতৃত্বের একগুঁয়েমিতে তারা জাতিকে বিভক্ত করেননি। ঝুঁকি নেননি। ওয়াক ওভার দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকে, দিয়েছেন সহায়তা-পরামর্শ। এ-এক অনন্য মহানুভবতা।
৩ মার্চের পর এক রাতে কার্ফ্যু ভাঙার জন্য কাশেম ভাইয়ের ছোট ভাই ওয়াদুদসহ আমরা কয়েকজন মিছিল করে মহল্লা থেকে সেøাগান দিতে দিতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যাচ্ছিলাম। সাকুরার কাছে যাওয়ার পরপরই ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান নেওয়া পাক সৈন্যরা ফাঁকা গুলি শুরু করে। তখনো আমাদের নির্বিচারে হত্যার লাইসেন্স তারা পায়নি বলে বেঁচে গেলাম সে-যাত্রা। দৌড়ে চলে আসি বাসায়। এ ঘটনার পর মার্চের মাঝামাঝি আমার মা, ভাবী ও ছোটভাই ইউসুফসহ আমাকে জোর করে গ্রামের বাড়ি আড়াইহাজারের ইজারকান্দিতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ঢাকা রয়ে গেলেন বড় ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ ও বাবা মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। গ্রামের বাড়ি গিয়ে মন টিকছিল না। মনে হচ্ছিল এতো বড় আন্দোলন ও আয়োজন থেকে দূরে থাকবো? আমি কী এতোই ভীরু? এরপর একেবারে মালির ঘাড়ে গিয়ে পড়লাম। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় উপস্থিত হলাম ঢাকার বাসায়। সবাই উৎকন্ঠিত হয়ে পড়লো আমাকে দেখে। কিছু করার নেই। অনেক পথ হাটার কারণে ক্লান্ত ছিলাম বলে ঘুমিয়ে পড়লাম। কতক্ষণ পরে ঘুম থেকে উঠে জানলাম, খোলা জীপে শেখ কামাল ও আওরঙ্গ আমাদের মহল্লায় এসে কাশেম ভাইকে কিছু নির্দেশ দিয়ে দ্রুত চলে গেছেন। আমাদের গলিতে ব্যারিকেড দেওয়া শুরু করলাম। আমাদের দোকানের কয়েকগজ মাত্র দূরে দি পিপল ও গণবাংলা পত্রিকার অফিস। টিক্কা খান বেজায় খাপ্পা ছিল পত্রিকা দুটির ওপর, বিশেষ করে টিক্কার ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন ছাপা হওয়ায়। আমাদের ছোটাছুটির মধ্যেই শুরু হয়ে গেল ক্র্যাক ডাউন। রাত ১২টার পর বিভীষিকা নেমে এলো ঢাকায়। আমরা লুকোলাম হোটেল গ্রীনে। লুকোনো অবস্থায়ই দেখলাম দি পিপল ও গণবাংলায় আগুন দিচ্ছে পাকিস্তানী মিলিশিয়ারা। সঙ্গে নিপ্পন মটর্সও জ্বললো। পাশের কাটাবন বস্তিতে দেখলাম আগুনের শিখা। হোটেল গ্রীন থেকে পূর্ব পাশের সাকুরা পর্যস্ত বামপাশের প্রতিটি দোকান পুড়িয়ে দিল তারা। হোটেল গ্রীন আর তার সামনে আমাদের দোকানসহ অনেকগুলি দোকান বেঁচে গেল ভাগ্যক্রমে। কারণ এই জায়গার মালিক নওয়াব আয়েশা বেগম, যিনি ইয়াহিয়া খানের দূর সম্পর্কের বোন। মহল্লাটাও বেঁচে গেল বিহারীরা এখানে থাকে বলে। প্রায় দুইদিন অবরুদ্ধ থাকার পর শুক্রবার জুমার নামাজের আগে কার্ফ্যু তোলার পর আমরা তিনজন তিন দিকে বেরিয়ে পড়লাম, যাতে মারা পড়লেও একসঙ্গে সবাই না মরি। আমি চলে গেলাম বন্ধু আনিসের সঙ্গে কলাকোপার আগলী-গালিমপুরে। আনিস নিপ্পন মটর্সে কাজ করতো। বাবা গেলেন কাকরাইল মসজিদের তাবলিক জামাতিদের সঙ্গে। বড় ভাই গেলেন আরেক কাফেলায়।
গ্রীন হোটেল থেকে বের হয়ে প্রথম দেখলাম আমার এক বন্ধুর লাশ, আমাদের এলাকার খাগকান্দার সিদ্দিক ভাই। সাকুরার পাশে তার দোকানে জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে বসে আছেন। খুব ঘনিষ্ট ছিলাম। আমরা প্রায়ই একসঙ্গে দোকানের মাল কিনতে মৌলভীবাজার যেতাম, এক লঞ্চে বাড়ি ফিরতাম। এই দোকানের মালিক ছিলেন এমদাদুল হক ভুঁইয়া, যিনি ১৯৯৬ সালে আড়াইহাজারে আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছিলেন। তার আগে ছিলেন জাতীয় পার্টির উপজেলা চেয়ারম্যান। তিনি পাকিস্তান আমলে কসকো নামক এক পাকিস্তানী কোম্পানীতে চাকরি করতেন। মাঝে মাঝে কথা হতো তখন।
শাহবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে ডানে-বামে অসংখ্য লাশ ও আহত মানুষ পেছনে ফেলে ভীত মানুষের কাফেলার সঙ্গে সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যায় পৌঁছলাম গালিমপুর। গ্রামের রাস্তার দু’ পাশে দেখলাম খাদ্য ও পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত মানুষ। শিশুদের জন্য নিয়ে এসেছে দুধ। বাঙালীর নৈতিকতায় সেদিন এসেছিল প্লাবন, যা আমরা ধরে রাখতে পারলে ইতিহাস হতো অন্যরকম।
গালিমপুর থেকে পরের সপ্তায় দুইদিন হেঁটে বাড়িতে পৌঁছে দেখি আব্বা আর বড় ভাই আগেই পৌঁছে গেছেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম।
আমাদের এলাকাটি চারদিকে মেঘনা নদী পরিবেষ্টিত দুর্গম চর। চৌদ্দটি গ্রাম নিয়ে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন। কেউ কেউ বলেন চৌদ্দমৌজা। চার পাশের মেঘনা দিয়ে আর্মি আসা-যাওয়া করলেও চরের ভেতর কখনো ঢোকেনি। পাকিস্তানের সমর্থক এবং মালেক মন্ত্রিসভার এসএম সোলায়মানের কিছু অনুগামী থাকলেও তারা তেমন মাথাচাড়া দেয়নি। দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা অবশ্য ঘটেছিল। একবার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে গোপনে এসএম সোলায়মানের কেএসপির স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে হাতে লেখা পোস্টার সাঁটা হয়েছিল, গ্রামের বাজারে অবস্থিত বিল্ডিংয়ের দেয়ালে। এনিয়ে বেশ কিছুদিন উত্তেজনা বিরাজ করে। কেউ কেউ আর্মি ডেকে আনার হুমকিও দিয়েছিল। মনে পড়ে, এ নিয়ে শেষে একটি গ্রাম্য সালিশও হয়েছিল কালাপাহাড়িয়া গ্রামের আম-বাগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো অশান্তি হয়নি।
আমাদের এলাকা থেকে একটি বড় গ্রুপ গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। আড়াইহাজারে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন আবদুস সামাদ। শামসুল হক ছিলেন নাম করা মুক্তিযোদ্ধা যিনি ১৯৮৯ সালে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। আমাদের ইউনিয়নের মূল নীতিনির্ধারক ছিলেন আমার বাবার দুই মামা, কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়সহ স্থানীয় মেডিকেল ও আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশিদ ও মিয়া মোহাম্মদ এরশাদউল্লা। এলাকার মানুষের কাছে খুবই শ্রদ্ধাভাজন এই দুজন ছিলেন যথাক্রমে সমাজকল্যাণ বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা ও পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজার। তাদের পরামর্শক্রমেই দুজন রাজাকার বাহিনীতে গিয়ে অস্ত্র হাতিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। তখন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকেও আহবান জানানো হচ্ছিল রাজাকারদের প্রতি, অস্ত্রসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য। এছাড়া এলাকার শান্তি কমিটি যাতে সত্যিকারের পাকিস্তানপন্থীদের হাতে চলে না যায় এবং এলাকাতে পাকিস্তানী সৈন্যদের যাতে ডেকে আনতে না পারে সেজন্য জনাব আবদুর রশিদ ও মিয়া মোহাম্মদ এরশাদউল্লাহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে আওয়ামী লীগেরই একজনকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করেন। ফলে আমাদের অঞ্চল বেঁচে যায় পাকিস্তানীদের আক্রমণের হাত থেকে। আমাদের ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন কদমিরচর গ্রামের ফজলুল হক। ইনি বেশ কয়েকবার এলাকার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। একাত্তরে ইনিও উল্লিখিত দুজনেরই বাছাই করা কমান্ডার ছিলেন।
আমরা ঢাকার দোকান ফেলে বাড়িতে গিয়েছিলাম প্রায় খালি হাতে। গ্রামে গিয়ে আমাদের একটি জমি বন্ধক রেখে বাজারে দোকান কিনলাম। মূলত বড় ভাই দেখাশোনা করতেন দোকান। এর আয় দিয়েই কেনো রকম সংসার চলতো। সে জন্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া হয়নি।
এপ্রিলের মাঝামাঝি বাবা বললেন, ঢাকা গিয়ে দোকান থেকে অন্তত কিছু মালপত্র নিয়ে আসবেন। তাঁর বয়স ও পরহেজগার অবয়ব দেখে সৈন্যরা তাকে কিছু করবে না বলে জানালেন। আমি বায়না ধরলাম তার সঙ্গে যাওয়ার। তখন ঢাকা কিশোর-যুবকদের জন্য ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ। অনেককে মিলিটারী ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলার সংবাদ গ্রামে থেকেই পেতাম। কারণ আমাদের এলাকার কিছু সরকারী ও বেসরকারী অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজে যোগ দিয়েছিলেন। বাবা প্রথমে ইতস্তত করলেও সঙ্গে নিতে রাজী হন। তার ধারণামতে, আমার বয়স ও শারীরিক কাঠামো মিলিটারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো ছিল না। কিন্তু হোটেল গ্রীনে পৌঁছার পর সবাই বাবাকে দুষতে লাগলেন আমাকে নিয়ে আসায়। গ্রীন হোটেলে আমার এক খালুও কাজ করতেন। দীন ইসলাম নামের একজন আত্মীয়ও ছিলেন। সবাই আমাকে তক্ষুণি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে বললেন। আমি ছাত্রলীগ করা ছেলে হিসেবে বিহারীদের কাছে চিহ্নিত ছিলাম বলে এই দুঃশ্চিন্তা। বাবা শেষে আমাকে কিছু দামী কিন্তু হালকা মাল নিয়ে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে চাবি দিলেন আমার হাতে।
গ্রীন হোটেল থেকে বের হয়ে দেখি মার্চের গোড়ার দিকে আমার হাতে-লেখা ‘চিকা’র ওপর সাদা রঙ্গের প্রলেপ। হাসান আসকারীর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পর তার মাঠে পড়ে থাকা ম্যানহোলের কয়েক হাজার পাইপ খাড়া করে দিয়ে ঘেরাও সৃষ্টি করা হয়েছিল। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তায় আমি কয়েকজনকে নিয়ে এসব পাইপের ওপর স্লোগান লিখেছিলাম। একেকটা পাইপে একটা করে অক্ষর। যেসব স্লোগান লিখেছিলাম সেসবের মধ্যে ছিল, জয় বাংলা, তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লও লও লও সালাম, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ইত্যাদি। লেখার ওপর প্রলেপ দেখে খারাপ লাগলেও আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে, এগুলি যে আমার হাতের লেখা সেটা আর প্রমাণ করা যাবে না। অবশ্য লেখার সময় কিছু অবাঙ্গালী যুবকও উৎসাহ দিয়েছিল, আমাদের গুডবুকে থাকার জন্য। এখনতো অবস্থা পাল্টে গেছে। খুব চিন্তিতভাবে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
আমাকে দোকানের সামনে দেখে প্রতিবেশি বিহারী সেলিম মিস্ত্রি এগিয়ে এসে যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে, এবার ভালো একটা গোসল দিয়ে দোকান খুলে বস, তোমার কোনো ভয় নেই, আমরা আছি ইত্যাদি। এই লোকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভাল ছিল। একসাথে ভলিবল খেলতাম। তারপরও গোসলের কথা বলল ঈঙ্গিতপূর্ণভাবে। অর্থাৎ, আগে আন্দোলন-সংগ্রাম যা করেছো ভুলে গিয়ে পরিশুদ্ধ হও। আরেক প্রতিবেশি বিহারী গোলাম হোসেন টিটকারি দিয়ে বলল, ‘কোথায় গেল তোমাদের সাড়ে সাত কোটি!’ মনটা খারাপ হয়ে গেল। আরো কিছু বিহারী ছেলেমেয়েকে আসতে দেখে দোকান খোলা নিরাপদ মনে করলাম না। গ্রীন হোটেলে ফিরে বাবার হাতে চাবি দিয়ে সব বললাম। বাবা বললেন, তুই এখানেই অপেক্ষা কর। আমি কিছু মাল নিয়ে আসি।
বাবা দোকান খুলতে গিয়ে দেখেন নওয়াব আয়েশা বেগম কাশেম ভাইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন বিহারীকে চিৎকার করে বলছে, ‘ইয়ে কাফের কাশেম কা দোকান। লুট লো সব..।’ পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সৈন্য। আমরা হোটেল থেকেই তার চিৎকার শুনছিলাম। বাবাও আমাদের দোকান না খুলে আবার ফেরত এলেন গ্রীনে। এবার আর কাউকে কিছু বলতে হলো না। আমি গ্রীনের পেছন দিয়ে মহল্লার শেষ কোনা ধরে শুকুর মোহাম্মদের বাড়িতে ঢোকার চিন্তা করলাম। দেওয়াল টপকানোর প্রস্তুতি নিতে গিয়ে দেখি বিহারী আহমদ আলীর স্ত্রী আমাকে ডাকছেন। বিহারীদের মধ্যে এই পরিবারটিকে সজ্জন হিসেবে দেখেছি। তাই খুব একটা ঘাবড়ালাম না। তিনি এসে আমার হাত ধরে তার বাসায় নিয়ে এলেন। একসময় আমরা এই বাসায় ভাড়া থাকতাম। আমার মা একে খুব পছন্দ করতেন। আমি কোনো ভুল করলে মা নিজে না বকে এর কাছে বলতেন। তিনি আমাকে তিরস্কার করে সাবধান করতেন। ঘরে ঢোকার পর তিনিও উর্দুতে অনুযোগ করলেন, আমি কেন আসলাম। দ্রুত ভাত বেড়ে দিলেন। আমি খেতে থাকি। তিনি বললেন, আর্মি শহর কব্জা করেছে। এরপর গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে। সাবধানে থেকো। তার অভয় পেয়ে বের হয়ে আমি মহল্লার এবার গলি ধরে চলে এলাম লোক প্রশাসন ভবনের কাছে। সেখানে থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিলাম কতক্ষণ। তারপর ডানে-বামে দেখে বামে শাহবাগ হোটেল পেড়িয়ে চলে এলাম তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান অফিসের সামনে, বাস স্টপে। রাস্তায় একজনমাত্র পরিচিতের সঙ্গে দেখা হলো। পাঞ্জাবী ক্ষৌরকার আল্লাদাত্তা খানের ছেলে। নামটা ভুলে গেছি। অতিশয় গরীব বলে মাঝে মাঝে ওকে এটাসেটা দিতাম। সে কুশল জিজ্ঞেস করে তার পথে চলে গেল। সে হয়তো ভেবেছিল মহল্লাতেই আছি। বাস থামতেই দ্রুত উঠে পড়লাম।
বাসে বসে মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করলাম, ঠিক এই সময়টাতেই কাশেম ভাইয়ের দোকান লুঠ করতে নওয়াব আয়েশা বেগম কেন আর্মি ডেকে আনলেন? ব্যাপারটি কাকতালীয়ও হতে পারে। আমাদের জন্য আর্মি ডেকে আনলে বাবা ও আমাকে নিশ্চয় তুলে দিতেন আর্মির হাতে। লুঠ করাতেন আমাদের দোকানও। হয়তো বাবাকে দেখার পর তার কাশেম ভাইয়ের কথা স্মরণ হয়েছে। হতে পারে আমাদের ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এটা করেছেন। এমনও হতে পারে, আমার বাবা শশ্রুমন্ডিত পরহেজগার হওয়ায় তিনি খানিকটা সমীহ করতেন বলেই হয়তো সেদিন তাকে মিলিটারীর হাতে তুলে দেননি। ভয়ের মধ্যেও আমার সবচেয়ে কৌতুককর লাগছিল এই মহিলার আচরণ। প্রায় সারাদিন মাতাল অবস্থায় থাকা তার হাতে জ্বলে দামী সিগারেট। খিস্তি করেন অহরহ। এই মহিলা যখন কাশেম ভাইকে ‘কাফের’ বলে গালি দেন তখন তাদের ইসলামের মানে কতই না ঠুনকো ঠেকে। তখন আওয়ামী লীগ ও ন্যাপসহ আন্দোলনরত সবাই তাদের কাছে কাফের। বিশেষ করে নওয়াব হাসান আসকারী ও খাজা শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে আগুন দেওয়ার কারণে মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ আরো বেড়ে যায়। মহল্লার বিহারীরা ছড়া কাটতে শুরু করে, ‘সর্দি-কাশি-হাঁপানী, মওলানা ভাসানী।’
নওয়াব আয়েশা বেগম শুধু নয়, খাজা তোফায়েল, খাজা হাবিবুল্লা প্রভৃতিকে দূর থেকে দেখলেই আমরা দামী সিগারেট সব লুকিয়ে ফেলতাম। কারণ, সেসব ওরা দেখতে পেলে থাবা মেরে নিয়ে যেতেন বিনে পয়সায়। জায়গা ও বাড়িভাড়া ছাড়া তাদের আর কোনো রোজগার ছিল না। কিন্তু খাই ছিল অনেক বেশি। তবে নওয়াব আয়েশা বেগমকে আমার ছিঁটগ্রস্ত মনে হয়েছে। তার নাতি, মানে মুন্নির বাচ্চাটা থালা ভাঙ্গার শব্দে একবার আনন্দ পেয়েছিল দেখে নওয়াব বেগম প্রায়ই অনেকগুলি নতুন থালা কিনে নাতিকে ভাঙ্গতে দিতেন, শব্দে তিনিও বিমল আনন্দ লাভ করতেন। ঘরের জনাপাঁচেক মানুষের জন্য কাজের লোক ছিল ডজনখানেক। কাউকেই বেতন দেওয়া হতো না। ওরা সেটা নানাভাবে পুষিয়ে নিতেন। কাউকে কাউকে কিছু জায়গা দেখিয়ে দেওয়া হতো থাকার জন্য। ওরা আবার ছাপরা তুলে সেগুলি গরীব মানুষদের কাছে ভাড়া দিতেন। রোজার সময় শুধু ইফতারের জিনিসপত্র কেনার জন্য নিয়োজিত ছিল সাত্তার নামের এক আধা-বাঙ্গালী। নওয়াব আয়েশা বেগম রোজায় গরীবদের ইফতার খাওয়াতেন, যদিও তার মদ্যপানে বিরতি ঘটতো না দিনেও। আমি খুব অবাক হয়ে দেখতাম, এই মহিলাই আবার তার ইফতারের জন্য সবচেয়ে ভালো মসুর ডাল ও খাঁটি সরিসার তেল আনাতেন দূরের রহমত ওয়েল মিলের গেট থেকে। যাহোক এই মহিলার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার বড় কারণ, তিনি ইয়াহিয়া খানের আত্মীয় হওয়ায় ২৫ মার্চ আমরা কয়েক শ মানুষ বেঁচে গিয়েছিলাম। আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল আমাদের দোকানটিও। বাবা পরবর্তী এক সময়ে দোকানের কিছু মাল আনতে পেরেছিলেন। কিছু মাল হাওয়া হয়ে যায়।
আজ আমার ওজন শরীরের সঙ্গে মানান-সইয়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু একাত্তরে ছিলাম লিকলিকে, মাত্র পচানব্বই পাউন্ড। ক্লাশ টেনে উঠেছি মাত্র। বাড়িতে কয়েকদিন থেকে গ্রামের বন্ধু সিরাজকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম আগরতলা। বলাবাহুল্য পালিয়ে। লুঙ্গির নিচে একটি ছোট চাদর ঢুকিয়ে বাড়ি থেকে নৌকায় গেলাম চন্দনপুর। মার কাছ থেকে বিদায় নিলাম চন্দনপুর বাজারে যাওয়ার কথা বলে। সেখান থেকে লঞ্চে রামকৃঞ্চপুর। সেখান থেকে চারঘাটে রাত কাটিয়ে গেলাম এক গ্রামে। নাম সম্ভবত মনিয়ন্দ। রাতে পার হলাম সিএন্ডবি ব্রিজ। রাজাকাররা শরণার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু দুই টাকা করে নিল। যারা মুক্তিযুদ্ধ করতে যাচ্ছে তাদের ফ্রি। রেললাইন পাড় হয়ে অনেক্ষণ হেঁটে ও ট্রাকে করে পৌঁছলাম আগরতলা।
প্রথমে গেলাম কংগ্রেস ভবনে। তার আগে পরিচিত একজনকে ধরে সার্টিফিকেট নিলাম আওয়ামী লীগের এক নেতার কাছ থেকে। (পরবর্তীকালে বর্ণনা শুনে ও ঘটনাপরম্পরায় জানতে পেরেছিলাম, যে ইনি ছিলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পিতা কফিল উদ্দিন চৌধুরী)। একদিন পর আমাদের পাঠানো হলো হাঁপানিয়া বেজ ক্যাম্পে। এখান থেকে ট্রেনিং-এর জন্য মুক্তিযোদ্ধা বাছাই করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য আমাকে অযোগ্য বিবেচনা করা হলো। বার বার লাইনে দাঁড়াই, কাজ হয় না। আমার ডান-বাম থেকে সবাইকে নেয়, আমাকে নেয় না। কারণ একটাই, বয়স যে কম তা শুধু নয়, অসম্ভব রোগা আমি। ওদের ধারণা, আমি বন্দুকই আগলাতে পারব না। কিন্তু আমি জানতাম পারব। তাই হাল না ছেড়ে বার বার দাঁড়াতাম লাইনে। একবার সিরাজকে রিক্রুট করলো, কিন্তু আমাকে করলো না। সিরাজ আবার আমাকে ছাড়া যাবে না। আমার জন্য বেচারার যুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়া হলো না।
এক সময় কঠিন পেটের পীড়া ও আমাশয় হয়ে গেল। হবারই কথা। বেজ ক্যা¤েপ ভাত দিত এক বেলা। সন্ধ্যার পর। প্রায় পঁচে যাওয়া আতপ চালের মধ্যে পোঁকাও থাকতো যা সন্ধ্যার অন্ধকারে দেখা না যাওয়ায় ভালোই হতো। সাথে কথিত ডাল, প্রায় পানিই বলা যায় একে। তবে শুনতাম যারা ট্রেনিং নিতে যেতে পারতো, সেখানে আরো উন্নত খাবার ছিল। এসব নিয়ে কারোই কোনো অনুযোগ ছিল না, আমাদেরও না। ভারত তার সাধ্যমতো যথেষ্ট করে চলছিল। কিন্তু অসুখতো কিছুই বিবেচনা করে না। অনেই অসু¯থ হয়ে পড়তো। অব¯থা সংকটজনক দেখে আগস্টে ফিরে এলাম বাড়িতে।
আবার সু¯থ হয়ে নভেম্বরে এলাকার আরো ত্রিশজনের মতো একত্রে রওয়ানা হলাম ত্রিপুরায়। এদের মধ্যে ছিলেন ঝাউকান্দির আবুল কাশেম, কালাপাহাড়িয়ার শফিকুল ইসলাম সিদ্দিক, স্থানীয় অভিনেতা আবদুর রহমান, ¯েœহভাজন সাংবাদিক শেখ ফরিদের পিতা আবদুল লতিফ ও আগেরবারের সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। এবার আর পালিয়ে নয়। মা, বাবা ও বড়ভাই নিজেরা নৌকায় তুলে দিলেন। গতবার পালিয়ে যাওয়ার সময়ও আসলে মা টের পেয়েছিলেন। পরে বলেছেন। মা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য রোজা রেখেছিলেন কয়েকটা। বাবাও নামাজ পড়ে দোয়া করতেন দ্রুত স্বাধীনতা লাভের জন্য। বিহারীদের সঙ্গে তাঁরও ছিল অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা।
কিন্তু সেবার আর সীমান্ত পাড় হওয়া গেল না। সীমান্ত তখন পাকিস্তানীদের সঙ্গে আলবদর, আল শামসরাও পাহারা দিচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের যাওয়া-আসা কঠিন হয়ে পড়লো। কারণ, আলবদর-আলশামসরা ¯থানীয় বলে জানতো কোন কোন পয়েন্টগুলি বন্ধ করতে হবে। কী ভয়ঙ্কর ও নিপুণ তাদের বিশ্বাসঘাতকতা। কয়েকদিন নৌকায় কাটিয়ে আবার ফিরে এলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম সীমান্তের অব¯থা শিথিল হওয়ার। কিন্তু তা আর হয়নি। সর্বাত্মক যুদ্ধ লেগে গেল। স্বাধীন হয়ে গেল আমার দেশ। আক্ষেপ রয়ে গেল আমার। আমার স্বজনেরা, আমাদের বীরেরা লড়াই করে, জীবন দিয়ে স্বাধীনতা দিয়ে গেল আমাদের। আমাকে দিয়ে গেল বাড়তি কিছু, স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম শ্রেণীর নাগরিকত্বও।
সশস্ত্র যুদ্ধে যেতে না পারার আক্ষেপ আজো রয়ে গেল । সান্ত¡না এইযে, চেষ্টার ক্রটি ছিলো না। পরবর্তী জীবনে মুক্তিযুদ্ধের মহান স্বপ্ন-চেতনার পক্ষে যা কিছু ঘটেছে সে-সবের মিছিলে থাকার চেষ্টা করেছি, করে আসছি।

নিউ ইয়র্ক, সর্বশেষ পরিবর্ধন-পরিমার্জন ১১ ডিসেম্বর ২০১৮। প্রথম প্রকাশ ২২ ডিসেম্বর ২০১১ ।
আহমেদ মূসা লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার। সাপ্তাহিক বর্ণমালার উপদেষ্টা সম্পাদক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here