বাঙালীর অলঙ্ঘনীয় ইতিহাস

।। সুব্রত বিশ্বাস  ।।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবের অধ্যায়। এ ইতিহাস এত বিরাট ও মহান যে অসংখ্য স্মৃতি ও ঘটনা জড়িত। অথচ পূর্ণ ইতিহাস আজও লেখা হয়নি। খুব সহসা যে লেখা হবে তার কোন লক্ষণ জাতি কারো কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছেনা। মধ্যে মধ্যে ইতিহাস বিকৃতির স্পর্ধা নতুন করে জাতির চেতনাকে শাণিত করে। এ মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দু’টি স্রোত প্রবহমান। একটি হচ্ছে সকল বাঁধা বিপত্তির বাইরে এসেও ইতিহাসের উন্মেষ ঘটছে। ইতিহাসের কাঁচা রসদ চারিদিক থেকে জড়ো হচ্ছে জাতির জীবনে। তথাপি সে রসদ কোনদিন ইতিহাসের পাতায় আদৌ পূর্ণতা পাবে বলে মনে হয়না। কারণ যারা ইতিহাসের মহানায়ক, যাদের কাছ থেকে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ও প্রকৃত রসদ আসতে পারতো মুক্তিযুদ্ধের

সুব্রত বিশ্বাস

সেই মহানায়কগণ কিছু লেখার আগেই ঘাতকদের হাতে নিহত হয়েছেন। তারপরও ইতিহাসের কাছাকাছি যারা ছিলেন তারাও কিছু না রেখে চলে গেছেন। অবশিষ্ট যারা এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন তাদের মধ্যে তেমন উদ্যোগ লক্ষণীয় বলা যায়না। তথাপি এই বিশাল ইতিহাসের ঘূর্ণিবৃত্তে বিচ্ছিন্নভাবে যারা আছেন তাদের অনেকেই কিছু না কিছু লিখে যাচ্ছেন নিজের দেখা ও স্মৃতি থেকে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থবাদী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল। তাহলো তখনকার বিশ্বের পরাশক্তি। পরাশক্তির বিশ্বে বসে ঐ প্রবল প্রতিপক্ষও লক্ষ্য রেখেছিল এবং পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের সহায়করূপে। তখন তাদের স্বরূপ যেভাবে দেখেছি এবং প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছি, স্বাধীনতা উত্তর বিগত ৪৭ বছরে বিভিন্ন সময় তাদের নগ্নতার আরও প্রকাশ আমরা লক্ষ্য করেছি। দুই পরাশক্তির অপর শক্তি এবং প্রতিবেশী আঞ্চলিক শক্তি ভারত ছিল মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মিত্র শক্তি। কেবল মিত্রশক্তি বলাটাও হয়তো যথার্থ নয়। কেননা তাদের সক্রিয় অংশ গ্রহণ ও সহায়তা ছাড়া আমাদের পক্ষে বিজয় অর্জন সম্ভব ছিলনা। সুতরাং তারা আমাদের ইতিহাসের অংশও। তাদের কাছেও রয়েছে আমাদের ইতিহাসের বিরাট রসদ। এসব মিলেই হতে হবে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এখন পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে এবং যারা খ-িতভাবে স্মৃতি লিখে যাচ্ছেন একদিন তার মিলিত নির্যাশ থেকেই লেখা হবে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। তবে তখনকার ইতিহাসবিদদের একটি বাড়তি কাজ করতে হবে, সেটা হলো-পঁচাত্তর পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের গায়ে যে কাদা লেপন করা হয়েছে সে কাঁদা তাদের পরিস্কার করতে হবে।
মূলতঃ রাজনীতির কূটচালই ইতিহাসের গায়ে কাদা লেপনের কারণ। যদিও এটাকে কূটচাল বলা যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামেরই ফসল। সুতরাং রাজনীতি এখানে বিরুদ্ধ বা প্রতিপক্ষ নয়। আসলে এ কাাদা লেগেছে অপরাজনীতি, যে রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে পচাত্তরে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই এ অপরাজনীতির ঘটনা ঘটেছে আমাদের দেশপ্রেমে খাদ ছিল বলে। তাই আজ এত ষড়যন্ত্র। সে ষড়যন্ত্র দেশে বিদেশে এমনকি বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরেও।

তবে একথা ঠিক, যে যতই মুখোশ পরে বেঈমানী করুক, যতই ইতিহাসের গায়ে কাাঁদা লেপুক বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্রুবতারার মত সত্য। সে সত্যকে চাপিয়ে রাখা যাবেনা। এভাবেই সত্যের মুখোমুখি হবে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তাকে প্রতিরোধ বা রুখে দেবার শক্তি কারো নেই। ৪৭তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে আমাদের সেই প্রত্যয়ই পাথেয় হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here