ঊনবাঙাল‘র সাহিত্য সভায় কবি এজরা পাউ-কে নিয়ে আলোচনা

বর্ণমালা ডেস্ক: নিউইয়র্কের সাহিত্য সংগঠন ঊনবাঙাল‘র একত্রিশতম সভায় মূল আলোচ্য বিষয় ছিল আমেরিকান কবি ‘এজরা পাউ- ও তাঁর সাহিত্যকর্ম’। এজরা পাউ-ের বর্ণাঢ্য এবং বিতর্কিত জীবন ও সাহিত্য কর্মের মূল্যায়ন করে একাডেমিক বক্তব্য রাখেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। ‘এজরা পাউ- ও রবীন্দ্রনাথ’ এই বিষয়ে বক্তব্য রাখেন কুইন্স লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান আবদল্ল­াহ জাহিদ। এ ছাড়া এজরা পাউ-ের কবিতা পড়ে শোনান নাসরিন চৌধুরী, রওশন হক ও জুলি রহমান। নাসরিন চৌধুরী ও জুলি রহমান তাঁদের নিজের লেখা কবিতাও পড়ে শোনান। এ ছাড়াও স্বরচিত কবিতা/ছড়া পাঠ করেন মাহবুব হাসান, শাহ আলম দুলাল, লুৎফা শাহানা, আলম সিদ্দিকী, রাজু ভৌমিক প্রমূখ। আসরটি বসেছিল গত ২৭ জানুয়ারি রবিবার জ্যামাইকার স্টার কাবাব রেস্টুরেন্টের পার্টি হলে।

কাজী জহিরুল ইসলাম বেশ হাস্যরসাত্মক ভাবে তাঁর বক্তব্য শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের নিয়ে যান পাউ-ের চিত্রকল্পের গভীরে। তিনি বলেন, অনেক বাঙালি পাঠক এখনো মনে করেন এজরা পাউ- একজন নারী। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, কৈশোর বয়সে তিনি হিল্ডা ডুলিটলের প্রেমে পড়েন, তাঁকে বিয়ে করতে চেয়ে, চাল-চুলোহীন ভবঘুরে বলে হিল্ডার পিতা অধ্যাপক চার্লস ডুলিটলের ভর্ৎসনা কুড়ান। মেরি মুর নামের আরো একটি মেয়ের কাছ থেকেও তিনি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হন। পেলসিনভানিয়া কলেজ তাকে ছাড়তে হয় বাজে ফলাফলের কারণে, হেমিল্টন কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেও, পরবর্তিতে পিএইচডি করতে গিয়ে আবারও অপমানিত হন। শিক্ষকরা তাঁকে বলেন, তুমি আমাদের সকলের সময় নষ্ট করছো। ইন্ডিয়ানায় শিক্ষকতা করতে গিয়ে সেখান থেকেও চাকরীচ্যুত হন। শেষমেশ তিনি ইওরোপেই থিতু হন। যখন তাঁর ৩৬ বছর বয়স তখন ওলগা নামের ২৬ বছর বয়সী এক পিয়ানোবাদকের প্রেমে পড়লেও তখন তিনি ছিলেন বিবাহিত, ঔপন্যাসিক অলিভি

য়া সেক্সপিয়ারের কন্যা ডরোথি তাঁর স্ত্রী। দুজনের গর্ভে পাউ-ের দুটি সন্তান জন্ম নেয়। ওলগার ঘরে কন্যা মেরি এবং ডরোথির ঘরে পুত্র ওমর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওলগা ছিলেন ইতালির প্রেসিডেন্ট বেনিটো মুসোলিনির ব্যক্তিগত পিয়ানোবাদক, সেই সূত্রে পাউ- তাঁর সাথে দেখা করেন এবং যুদ্ধে মুসোলিনি এবং হিটলারকে সমর্থন দেন। তিনি রেডিও রোমে নিয়মিত এন্টি-সেমেটিক বক্তব্য দিতে শুরু করেন, পত্র পত্রিকায় ইতালি-জার্মানির পক্ষে প্রচারণামূলক লেখালেখি করতে থাকেন। তাঁর এই ভূমিকাই তাঁকে বিতর্কিত করে তোলে, যার ফলে একজন অসাধারণ চিত্রকল্পবাদী কবি হওয়া সত্বেও, এবং কমপক্ষে দশবার তাঁর নাম প্রস্তাব করা হলেও, তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

কাজী জহিরুল ইসলাম তাঁর কবিতার নানান দিক তুলে ধরে দশটি বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করেন। ১. কলেবরে ছোটো ২. প্রতীকী ৩. জাদুবাস্তবতা ৪. পারম্পর্যমুক্ত ৫. শিরোনাম থেকেই কবিতার শুরু। শিরোনাম বাদ দিলে কবিতাটি অর্থহীন বা লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে। প্রায় প্রতিটি শিরোনামই কবিতার অবধারিত অংশ। ৬. চিত্রকল্প পরিস্ফুট করে তুলতে শব্দ তুলে এনেছেন যে কোনো ভাষা থেকে। তাই একই কবিতায় মিশ্রভাষার উপস্থিতি। ৭. নিজের চিন্তা প্রকাশে অকপট, দ্বিধাহীন কিন্তু তাঁর কবিতায় রয়েছে দ্বিধার দুলুনি। যা কবিতায় আধুনিকতার নতুন দিক নির্দেশনা। ৮. কবিতায় অভিজ্ঞতার প্রতিফলন তাঁর সততার নির্দেশক। ৯. শিল্পপ্রধান আঙ্গিক ১০. বৃহত্তের কন্ডেন্সড ফর্ম।

আমেরিকার আইডাহো স্টেটে ১৮৮৫ সালে জন্মগ্রহণকারী কবি এজরা পাউ- ইতালির ভেনিসে ১৯৭২ সালে মৃত্যবরণ করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী, নয় সন্তান, প্রেমিকা ওলগাই তাঁর পাশে ছিলেন।

আবদল্ল­াহ জাহিদ বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা শিকাগোর পোয়েট্রি ম্যাগাজিনে ছাপানোর সুপারিশ করেন এজরা পাউ- এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতার উচ্ছসিত প্রশংসা করে প্রবন্ধ লিখেন। কিন্তু ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেলে তিনি এবাউট টার্ন করে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ঊনবাঙাল কর্তৃক অ্যামাজনে প্রকাশিত শামীম আল আমিনের ইংরেজি গল্পের বই ‘ডিপ নাইট স্কাই’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এটি ঊনবাঙালের নবম প্রকাশনা। বইয়ের এগারোটি গল্প অনুবাদ করেন সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান এবং নুসরাত সুলতানা। বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন মেঘনা কাজী।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ড. আবেদিন কাদের, মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান শানু, মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস নাজমি, ভাষা আন্দোলন গবেষক ওবায়দুল্লাহ মামুন, নিউ ইয়র্ক শিক্ষা বিভাগে কর্মরত জসীম উদ্দীন, মুক্তি জহির, শামীম আল আমিন, রাজিয়া নাজমী, রুহুল কুদ্দুস প্রমূখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here